মুম্বই, ১৫ জুন (আইএএনএস): শিবসেনা (ইউবিটি) প্রধান উদ্ধব ঠাকরের বাসভবন ‘মাতোশ্রী’-তে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর ফের জোরদার হয়েছে দলভাঙনের জল্পনা। দলের নয়জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে মাত্র চারজন বৈঠকে সরাসরি উপস্থিত থাকায় উদ্ধব শিবিরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
রবিবারের ওই বৈঠকে বাকি পাঁচ সাংসদ ভিডিও কনফারেন্স বা ফোনের মাধ্যমে যোগ দেন। এই ‘হাইব্রিড’ উপস্থিতিকে কটাক্ষ করেছে একনাথ শিন্ডে নেতৃত্বাধীন শিবসেনা।
শিন্ডে শিবসেনার মুখপাত্র শীতল মাত্রে বলেন, “উদ্ধব ঠাকরে ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে সরকার চালাতেন, এখন তাঁর সাংসদরাও একইভাবে দল চালাচ্ছেন। এতে দলের উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ কতটা দুর্বল, তা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে ‘অপারেশন টাইগার’ নিয়ে জল্পনার মধ্যেই এই জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে ও তাঁর ঘনিষ্ঠ নেতারা শিবসেনার উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বিতীয় দফার বড় বিভাজনের চেষ্টা করছেন।
সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী, দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে কোনও ভাঙনকারী গোষ্ঠীর দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। সেই হিসেবে শিন্ডে যদি উদ্ধব শিবিরের ছয়জন সাংসদকে নিজের দিকে টানতে পারেন, তবে সংসদে উদ্ধব গোষ্ঠীর অবস্থান বড় ধাক্কার মুখে পড়বে এবং বালাসাহেব ঠাকরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের দাবিতে শিন্ডের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
যদিও শিবসেনা (ইউবিটি)-র সাংসদ সঞ্জয় রাউত দলত্যাগের জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে পাল্টা ‘অপারেশন উলফ’-এর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যার লক্ষ্য হবে শিন্ডে শিবিরের বিধায়কদের নিজেদের দিকে টানা। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে ক্ষমতাসীন জোটের হাতে অনেক বেশি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সুবিধা রয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, উদ্ধব ঠাকরের সাংসদরা একাধিক চাপের মুখে রয়েছেন। বিরোধী শিবিরে থেকে আগামী পুরসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া আর্থিকভাবে কঠিন হয়ে উঠছে। পারভানি কেন্দ্রের সাংসদ সঞ্জয় জাধব সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন, “নির্বাচনের সময় আর্থিক হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে কী হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।”
মহাবিকাশ আঘাড়ি (এমভিএ)-র শরিক হিসেবে কংগ্রেস ও শরদ পওয়ারের এনসিপির সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অনেক সাংসদের আশঙ্কা, জোট রক্ষার স্বার্থে নিজেদের প্রভাবক্ষেত্রের বিধানসভা কেন্দ্র বা পুরসভার ওয়ার্ড ছাড়তে হলে দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের ভোটভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
২০২২ সালের রাজনৈতিক বিভাজনের পর উদ্ধব ঠাকরে দলের কর্মী-নেতাদের কাছে আগের তুলনায় বেশি সহজলভ্য হলেও, গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকার বহু সাংসদের অভিযোগ, দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র এখনও মুম্বই-কেন্দ্রিক নেতাদের হাতেই সীমাবদ্ধ।
বৈঠকের পর সাংবাদিক বৈঠকে সঞ্জয় রাউত অনুপস্থিত পাঁচ সাংসদের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, যবতমালের সাংসদ সঞ্জয় দেশমুখ কন্যার বিয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন, শিরডির সাংসদ ভাউসাহেব ওয়াকচৌরের স্ত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এবং হিঙ্গোলির সাংসদ নাগেশ পাটিল অষ্টিকার স্থানীয় বিধান পরিষদ নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
তবুও দলের অন্দরে উদ্বেগ কাটছে না। সূত্রের দাবি, আদিত্য ঠাকরের জন্মদিন উপলক্ষে শনিবার ও রবিবার সমস্ত সাংসদকে মুম্বইয়ে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যাতে দলের ঐক্যের বার্তা দেওয়া যায়। কিন্তু পাঁচ সাংসদের সরাসরি অনুপস্থিতিকে অনেকেই নীরব অসন্তোষের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজনৈতিক ঘটনাও জল্পনা বাড়িয়েছে। সাংসদ নাগেশ পাটিল অষ্টিকারকে মুখ্যমন্ত্রী শিন্ডের সরকারি বাসভবনে দেখা গিয়েছে। নাসিকের সাংসদ রাজাভাউ ওয়াজে মুখ্যমন্ত্রীর পুত্র শ্রীকান্ত শিন্ডের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অন্যদিকে শিরডির সাংসদ ভাউসাহেব ওয়াকচৌরে রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী উদয় সামন্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন উদ্ধব ঠাকরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ক্ষোভ ও অসন্তোষ দূর করা। যদি মাতোশ্রী আঞ্চলিক নেতাদের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা এবং এমভিএ জোটের মধ্যে তাদের রাজনৈতিক ক্ষেত্র সুরক্ষিত রাখতে না পারে, তবে বৈঠকে দেখা যাওয়া এই ‘হাইব্রিড’ উপস্থিতি ভবিষ্যতে স্থায়ী দলত্যাগে পরিণত হতে পারে।
তাদের মতে, ‘অপারেশন টাইগার’ এখনও শেষ হয়ে যায়নি; মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে মাত্র।


















