আগরতলা, ১৯ জানুয়ারি: গত ১০ই জানুয়ারি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১০৫তম স্কচ পুরস্কার সম্মেলনে উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি অনন্য সাফল্য জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি পেল।
ত্রিপুরা রাজ্যের ত্রিপুরা পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উন্নয়ন সংস্থা (ট্রেডা) প্রত্যন্ত ও জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় সৌরশক্তি চালিত মাইক্রোগ্রিড স্থাপনের মাধ্যমে জাতি ও জনজাতির কল্যাণে অভূতপূর্ব অবদানের জন্য ২০২৫ সালের স্কচ রৌপ্য পদকে ভূষিত হয়। এই সম্মাননা প্রদান করেন স্কচ গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সর্বাধিনায়ক সমীর কোচ্ছার।
ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বহু আদিবাসী বসতিতে আজও বিদ্যুতের আলো পৌঁছানো এক বড় চ্যালেঞ্জ। ভৌগোলিক জটিলতা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সেখানে প্রচলিত বিদ্যুৎ গ্রিড সম্প্রসারণ দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় অসম্ভব হয়ে রয়েছে। কোথাও বিদ্যুৎ নেই, কোথাও আবার সরবরাহ অত্যন্ত অনিয়মিত। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে এই জনগোষ্ঠী বহু বছর ধরে পিছিয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় সরকারের পিএম -ডিভাইন প্রকল্প এবং রাজ্য সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার আওতায় ট্রেডা উদ্যোগ নেয় সৌরশক্তি নির্ভর মাইক্রোগ্রিড স্থাপনের।
ত্রিপুরার ২৭৪টি প্রত্যন্ত জনজাতি পাড়া যেমন ধলাই জেলার রাজধান পাড়া, ইচাছরা, হরিয়ামনি পাড়া, গোমতী জেলার তৈনানি বাজার পাড়া, যাদব পাড়া, দক্ষিণ ত্রিপুরার চিন্তা রাম পাড়া, পোয়াংবাড়ি , খোয়াই জেলার পূর্ণচন্দ্র কারবঙ্গ পাড়া যেখানে প্রচলিত গ্রিড পৌঁছানো সম্ভব নয় বা নির্ভরযোগ্য নয়, সেখানে ২, ৫, ১০, ১৫, ২০ ও ২৫ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার মাইক্রোগ্রিড স্থাপন করা হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যা সরাসরি উপকৃত করেছে ৯,৭৬২টি পরিবারকে।
পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হয়েছে ৮১.০২ কোটি টাকা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে প্রত্যেক পরিবারে চারটি করে বৈদ্যুতিক আলো ও একটি চার্জিং সকেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাম ও জনবহুল স্থানে স্থাপন করা হয়েছে সৌরচালিত স্ট্রিট লাইট, যা রাতের নিরাপত্তা ও চলাচলকে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ করে তুলেছে।
মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে বাস্তব চিত্র। অনেক পাড়ায় বর্ষা ও প্রাক-বর্ষাকালে যেখানে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা ঘটে , সেখানে এখন সৌর মাইক্রোগ্রিডের কারণে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎহীনতায় জর্জরিত এই জনপদগুলোর জীবনযাত্রায় এসেছে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন।
কেরোসিনের বাতির অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এখন সৌর আলোয় আলোকিত হচ্ছে আদিবাসী ঘরবাড়ি। শিক্ষার্থীরা রাতে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে, যার ফলে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও সাফল্য বেড়েছে। মোবাইল চার্জিং ও টেলিভিশনের সুবিধায় মানুষ এখন তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে। ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বয়ন শিল্পের কাজ সন্ধ্যার পরেও চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হওয়ায় জীবিকার নতুন পথ খুলে গেছে। ছোট দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো রাত পর্যন্ত খোলা রাখতে পারছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
সব মিলিয়ে সৌর মাইক্রোগ্রিড শুধু বিদ্যুতের আলোই নয়, প্রত্যন্ত আদিবাসী সমাজের জীবনে এনে দিয়েছে শিক্ষা, নিরাপত্তা, আত্মনির্ভরতা ও উন্নয়নের নতুন আলো।

