সবুজ সামুদ্রিক বিপ্লবে গতি ভারতের: জলবায়ু লক্ষ্য মেনে বন্দর ও শিপিং খাতে বড় রূপান্তর

নয়াদিল্লি, ১৬ ডিসেম্বর : সবুজ ও টেকসই সামুদ্রিক ব্যবস্থার দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে ভারত। বন্দর ও শিপিং খাতে দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি জলবায়ু প্রতিশ্রুতি, জ্বালানি রূপান্তর লক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই রূপান্তর ঘটানো হচ্ছে বলে সোমবার প্রকাশিত সরকারি তথ্যে জানানো হয়েছে।

ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই পরিমাণের নিরিখে বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। গত এক দশকে দেশের বন্দরগুলির পরিকাঠামো ও সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৪–১৫ অর্থবর্ষে যেখানে প্রধান বন্দরে পণ্য পরিবহণের পরিমাণ ছিল ৫৮১ মিলিয়ন টন, সেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫৫ মিলিয়ন টনে—যা দশ বছরে ৪৭.১৬ শতাংশ বৃদ্ধি। এই সম্প্রসারণ ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হলেও, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও বাড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সামুদ্রিক নীতি ‘ইনটেন্ডেড ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে শিপিং খাতে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন ৪০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

ভারতের সবুজ সামুদ্রিক অভিযানের ভিত্তি হিসেবে পুরনো ইন্ডিয়ান পোর্টস অ্যাক্ট, ১৯০৮ বাতিল করে চালু করা হয়েছে ইন্ডিয়ান পোর্টস অ্যাক্ট, ২০২৫। নতুন আইনে পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বন্দর পরিচালনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মারপোল ও ব্যালাস্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট কনভেনশনের মতো আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

২০২১ সালে চালু হওয়া মেরিটাইম ইন্ডিয়া ভিশন ২০৩০ এই রূপান্তরের রূপরেখা হিসেবে কাজ করছে। এতে নবীকরণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, নির্গমন হ্রাস, জল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও কেন্দ্রীভূত নজরদারি ব্যবস্থাসহ ১৫০টি উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে মেরিটাইম অমৃত কাল ভিশন ২০৪৭-এর আওতায় প্রায় ৮০ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বন্দর, শিপিং, অভ্যন্তরীণ জলপথ, জাহাজ নির্মাণ ও সবুজ শিপিং খাতে ৩০০টিরও বেশি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

২০২৩ সালে জারি হওয়া ‘হরিত সাগর গ্রিন পোর্ট গাইডলাইনস’-এর মাধ্যমে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি টন পণ্যে কার্বন নির্গমন ৩০ শতাংশ এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ৭০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নবীকরণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ২০৩০ সালে ৬০ শতাংশ ও ২০৪৭ সালে ৯০ শতাংশে পৌঁছনোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দর যন্ত্রপাতির বৈদ্যুতিকীকরণ, সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি, বর্জ্য জল পুনর্ব্যবহার ও মিঠে জলের ব্যবহার হ্রাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নিউ ম্যাঙ্গালুরু পোর্ট ইতিমধ্যেই শতভাগ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় স্তরে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

দেশের বিভিন্ন বন্দরে সৌর ও বায়ুশক্তি প্রকল্প দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে। কাণ্ডলা, বিশাখাপত্তনম, তুতিকোরিন, কোচিন, চেন্নাই, পারাদ্বীপ, মর্মুগাঁও, মুম্বই, জওহরলাল নেহরু পোর্ট, হলদিয়া ও কামারাজার বন্দরে একাধিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু বা নির্মীয়মাণ রয়েছে। মর্মুগাঁও পোর্ট ‘গ্রিন শিপ ইনসেনটিভ’ চালু করে এশিয়ার হাতে গোনা কয়েকটি বন্দরের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

বন্দরে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ৫০ শতাংশের বেশি ২০৩০ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এলএনজি বাংকারিং, শোর-টু-শিপ পাওয়ার সাপ্লাই, ধুলো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বৃহৎ বৃক্ষরোপণ ও জল সংরক্ষণ প্রকল্প জোরদার করা হচ্ছে।

‘জিরো অ্যাক্সিডেন্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হয়েছে। নাবিকদের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে। পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে সব বন্দরের পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সূচক পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সাগরমালা প্রকল্পের অধীনে ৮৪০টি প্রকল্পের কাজ চলছে। মহারাষ্ট্রে ভাধাভান গ্রিনফিল্ড পোর্ট, গ্রিন টাগ ট্রানজিশন প্রোগ্রাম, হরিত নৌকা উদ্যোগ এবং ন্যাশনাল গ্রিন হাইড্রোজেন মিশনের মতো প্রকল্পগুলিও গতি পেয়েছে। ডেনমার্ক, নরওয়ে, সিঙ্গাপুরসহ একাধিক দেশের সঙ্গে সবুজ সামুদ্রিক অংশীদারিত্বও জোরদার করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, নীতিগত সংস্কার, বিপুল বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ সবুজ সামুদ্রিক শক্তি হয়ে ওঠার পথে এগোচ্ছে—এমনটাই সরকারি মহলের দাবি।