মেডক/হায়দরাবাদ, ১ জুলাই:তেলেঙ্গানার মেডক জেলার পাসামাইলারাম শিল্প অঞ্চলের সিগাচি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড-এর একটি রাসায়নিক কারখানায় সোমবার সকালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ৩৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও বহু মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ এখনো চলছে, এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মৃতদেহ আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমন এক মর্মান্তিক ঘটনার পর কোম্পানির শীর্ষ কর্তৃপক্ষের চরম নীরবতায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেলেঙ্গানা রাজ্য সরকার। মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী এ রেভন্থ রেড্ডি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। তার সঙ্গে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী— শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী কে টি রামারা শ্রীধর বাবু, উপমুখ্যমন্ত্রী ডা. দমোদর রাজা নারসিমহা, জি বিবেক এবং পি শ্রীনিবাস রেড্ডিও ছিলেন।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বিস্ফোরণটি ঘটে সকাল ৮টা ১৫ থেকে ৯টা ৩৫-এর মধ্যে, কারখানার গুণমান নিয়ন্ত্রণ বিভাগের ড্রায়ার ইউনিটে। সেখানে উৎপাদিত হতো মাইক্রোক্রিস্টালাইন সেলুলোজ (MCC)—যা ওষুধ প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ড্রায়ার ইউনিটের যান্ত্রিক ত্রুটি থেকেই এই বিস্ফোরণের সূত্রপাত হতে পারে। বিস্ফোরণের পর মুহূর্তেই ভবনটি ধসে পড়ে এবং ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ আগুন।
বিস্ফোরণে নিহত ও আহতদের মধ্যে অধিকাংশই অভিবাসী শ্রমিক, যারা এসেছিলেন বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। তেলেঙ্গানা পুলিশের মেডক জেলা পুলিশ সুপার পরিতোষ পঙ্কজ জানিয়েছেন, “৩১ জনের মৃতদেহ ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৩ জন মারা গেছেন। আরও কয়েকজনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।” আহতদের হায়দরাবাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী রেভন্থ রেড্ডি বিস্ফোরণের পরের পরিস্থিতি সরাসরি তদারকি করেন এবং কোম্পানির কর্মকর্তাদের তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেন। তিনি বলেন, “এত বড় দুর্ঘটনার পরও যদি শীর্ষ কর্তৃপক্ষ উপস্থিত না থাকে, তাহলে তারা কেন একটি কারখানা চালাচ্ছেন?”
তিনি আরও যোগ করেন, “আপনাদের চেয়ারম্যান এখানে না এসে দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করা এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
সংস্থার একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান সোমবারই ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। তবে তাদের অনুপস্থিতি এবং প্রেস ও প্রশাসনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না রাখার কারণে সরকারের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে।
শিল্পমন্ত্রী কে টি শ্রীধর বাবু বলেন, “এটি মানবিক দিক থেকে চরম অবজ্ঞার পরিচয়। সরকার এই ঘটনার পূর্ণ তদন্ত করবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরকম একটি ঘটনা ঘটার পর আপনারা নির্বিকার থাকতে পারেন না।”
মুখ্যমন্ত্রী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আহতদের চিকিৎসায় কোনোরকম বিলম্ব বা আর্থিক প্রতিবন্ধকতা না হয়। তিনি বলেন, “চিকিৎসার জন্য যত অর্থ প্রয়োজন, রাজ্য সরকার তা দেবে। প্রতিটি হাসপাতালকে আমরা ‘ব্ল্যাঙ্কেট অনুমোদন’ দিয়েছি।”
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যারা বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দেবে।
মন্ত্রী ডা. রাজা নারসিমহা জানান, “ডিরেক্টর অব ফ্যাক্টরিজ আগে থেকেই কোম্পানিকে কিছু নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেইসব নির্দেশনা কতটা মানা হয়েছে, তা আমরা খতিয়ে দেখব।”
সিগাচি ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, “আমরা সকল আহতের চিকিৎসার খরচ বহন করব। পাশাপাশি, বিমা থাকলে তারও সহায়তা পাবে পরিবারগুলি। আমরা তালিকা তৈরি করছি।”
তবে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণ নয়, শীর্ষ পর্যায়ের মানবিক সংবেদনশীলতা এবং আইনি দায়বদ্ধতা থেকেও কোম্পানির রেহাই নেই।
সিগাচি ইন্ডাস্ট্রিজে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা শুধু তেলেঙ্গানার নয়, সারা দেশের শিল্প নিরাপত্তার জগতে এক চরম সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, এই ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
তদন্ত চলছে। রাজ্যবাসী ও নিহতদের পরিবার এখন অপেক্ষা করছে—এই দুর্ঘটনার পেছনের সত্য, দায়িত্ব ও সুবিচার যেন দ্রুত প্রকাশ পায়।
2025-07-01

