মুম্বই, ৮ অক্টোবর (আইএএনএস): প্রবীণ অভিনেতা নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ। ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার ডোনা পাউলা-র বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। মণিপাল হাসপাতাল, গোয়ার তরফে জানানো হয়েছে, তাঁকে বাড়িতে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে বলিউড থেকে দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগৎ—সর্বত্র নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
বিশিষ্ট অভিনেতা, নাট্যব্যক্তিত্ব এবং সমাজকর্মী হিসেবে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভারতীয় সিনেমায় নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছিলেন নানা পাটেকর। তীব্র অভিনয়, শক্তিশালী সংলাপ বলার ধরন, গভীর আবেগ এবং চরিত্রের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে মিশে যাওয়ার ক্ষমতার জন্য তিনি ছিলেন অনন্য। হিন্দি ও মারাঠি—দুই চলচ্চিত্র জগতেই তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শাহরুখ খান তাঁর প্রয়াণে আবেগঘন স্মৃতিচারণা করেছেন। নানা পাটেকরের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, সেই সময় তিনি নার্ভাস হয়ে বারবার চুল ঠিক করছিলেন। নানা তাঁর হাত সরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘হিরোর মতো চুল সাজিও না, তুমি অভিনেতা।’ শাহরুখের কথায়, নানা কখনও তাঁকে খুশি করার জন্য কথা বলতেন না, বরং যা শোনা প্রয়োজন সেটিই বলতেন। ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’-এ একসঙ্গে কাজ করা দুই অভিনেতার বন্ধুত্ব পরবর্তীতেও বজায় ছিল। শাহরুখ জানান, নানা ছিলেন তাঁর পরামর্শদাতা, শিক্ষক, সমালোচক ও বন্ধু।
অক্ষয় কুমারও নানা পাটেকরের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ‘ওয়েলকাম’ এবং ‘হাউসফুল ৫’-এ একসঙ্গে কাজের স্মৃতি তুলে ধরে অক্ষয় বলেন, নানা ছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যাঁকে অভিনয়ের জন্য অতিরিক্ত কিছু করতে হতো না। তাঁর কণ্ঠ, তীব্রতা এবং অভিনয়ের সততা দর্শককে মুগ্ধ করত। ‘ওয়েলকাম’-এ উদয় শেঠি চরিত্রে নানা পাটেকরের অভিনয় আজও দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
অভিনেতা রীতেশ দেশমুখ নানা পাটেকরকে ‘অভিনয়ের ক্ষেত্রে অনন্য’ বলে উল্লেখ করে জানান, ‘ব্লাফমাস্টার’ ও ‘হাউসফুল ৫’-এ তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। মারাঠি ছবিতে তাঁর সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেল বলেও আক্ষেপ করেন রীতেশ। তাঁর কথায়, নানা ছিলেন পর্দার বাইরেও একজন নায়ক এবং মানুষের কল্যাণে তাঁর দাতব্য কাজ ছিল প্রশংসনীয়।
সুনীল শেট্টি, অর্জুন রামপাল ও বোমান ইরানিও শোকপ্রকাশ করেছেন। সুনীল শেট্টি বলেন, নানা ছিলেন নিজের মতো করে বেঁচে থাকা এক অসাধারণ মানুষ এবং এমন মানুষ আর তৈরি হয় না। অর্জুন রামপাল তাঁর প্রয়াণকে চলচ্চিত্র জগতের জন্য বিরাট ক্ষতি বলে উল্লেখ করেন। বোমান ইরানি স্মরণ করেন, নানা তাঁকে নিয়মিত হাঁটার পরামর্শ দিতেন। তাঁর কথায়, নানার অবদান যেন শোকের আড়ালে ঢাকা না পড়ে।
অনুপম খের জানান, ওয়াশিংটনে একটি অনুষ্ঠান শেষ করার পরই তিনি নানার মৃত্যুসংবাদ পান। মঞ্চে দর্শকদের করতালির পরও খবরটি শুনে তিনি গভীরভাবে ভেঙে পড়েন। তবে তিনি মনে করেন, নানা চাইতেন তিনি নিজের দায়িত্ব শেষ করুন। অনুপম বলেন, নানা ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁকে তিনি মনে করতেন আরও বহু বছর বেঁচে থাকবেন।
‘ওয়েলকাম’-এর পরিচালক আনিস বাজমি সংবাদমাধ্যমকে কিছুটা সময় দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নানার প্রয়াণের খবর তিনি এখনও মেনে নিতে পারছেন না এবং এই মুহূর্তে কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় নেই। ২০০৭ সালের ‘ওয়েলকাম’-এ নানা পাটেকরের উদয় শেঠি চরিত্রটি তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম জনপ্রিয় কমিক চরিত্র হয়ে ওঠে। অনিল কাপুরের মজনু ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর রসায়ন এবং সংলাপ বলার ধরন ছবিটিকে কালজয়ী জনপ্রিয়তা দেয়।
পঙ্কজ ত্রিপাঠী নানা পাটেকরকে শুধুমাত্র সহ-অভিনেতা নয়, বরং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পথ দেখানো এক গুরুর মর্যাদা দিয়েছেন। ‘কালা’ ছবিতে তাঁর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে পঙ্কজ বলেন, নানা অভিনয়ের সূক্ষ্মতা থেকে শুরু করে জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে পরামর্শ দিতেন। তাঁর প্রয়াণকে তিনি নিজের ব্যক্তিগত এবং গোটা চলচ্চিত্র জগতের জন্য গভীর ক্ষতি বলে উল্লেখ করেন।
দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতের তারকারাও নানার প্রয়াণে শোক জানিয়েছেন। কমল হাসান তাঁর সঙ্গে একটি পুরনো ছবি শেয়ার করে তাঁকে অসাধারণ শিল্পী এবং আরও বড় মাপের মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন। কৃষকদের জন্য তাঁর কাজ এবং কার্গিল যুদ্ধের সময় তাঁর স্বেচ্ছাসেবামূলক ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন কমল। চিরঞ্জীবী নানার শক্তিশালী অভিনয় এবং কৃষকদের প্রতি তাঁর সহমর্মিতার কথা তুলে ধরেন। পবন কল্যাণ বলেন, চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অসাধারণ গভীরতা ও বাস্তবতা এনে ভারতীয় সিনেমায় অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছেন।
আল্লু অর্জুন নানা পাটেকরকে ‘পথপ্রদর্শক শিল্পী’ হিসেবে স্মরণ করেন। মোহনলাল তাঁর অভিনয়ে গভীরতা, সততা ও তীব্রতার কথা উল্লেখ করেন। জুনিয়র এনটিআর বলেন, নানার অভিনয় কখনও অভিনয় বলে মনে হতো না, বরং পর্দায় জীবনেরই প্রকাশ বলে মনে হতো। ঋষভ শেট্টি তাঁর অভিনয়ের পাশাপাশি কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের জন্য কাজের কথাও স্মরণ করেন। নানির কথায়, প্রতিটি চরিত্রে নানার নিজস্ব প্রতিভার ছাপ থাকত।
হৃতিক রোশন নানার ‘হার্ড-হিটিং’ অভিনয়, স্বতঃস্ফূর্ত কমিক টাইমিং এবং স্মরণীয় চরিত্রগুলির প্রশংসা করেছেন। সঞ্জয় দত্ত তাঁকে ভাই ও বন্ধু হিসেবে স্মরণ করে বলেন, এই ক্ষতি শুধু তাঁর পরিচিত মানুষদের নয়, গোটা চলচ্চিত্র শিল্পের। জুহি চাওলা ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’ ও ‘গ্যাং’-এ নানার সঙ্গে কাজের স্মৃতি তুলে ধরেছেন।
পরিচালক রোহিত শেট্টি জানিয়েছেন, ‘গোলমাল এগেন’-এ নানা পাটেকর কোনও পারিশ্রমিক না নিয়েই ক্যামিও করেছিলেন। নানার সঙ্গে তাঁর রাতের ফোনালাপ, অকপট সমালোচনা এবং বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে রোহিত বলেন, নানা তাঁকে কখনও খুশি করার জন্য প্রশংসা করতেন না। ছবির পারিশ্রমিকের কথা উঠলে নানা তাঁকে একটি অনাথ আশ্রমে অর্থ দান করতে বলেছিলেন বলেও জানান রোহিত।
ফটোগ্রাফার অতুল কাসবেকরও নানাকে নিয়ে এক আবেগঘন স্মৃতি শেয়ার করেছেন। তিনি জানান, একবার নানা নিজের শেষকৃত্যের জন্য কাঠ জোগাড় করে রেখেছিলেন এবং রসিকতা করে বলেছিলেন, ভেজা কাঠে ধোঁয়া বেশি হয়—সেই ধোঁয়ার জন্য যেন মানুষ কাঁদতে না হয়। নানার ব্যক্তিত্বের মধ্যে থাকা রসিকতা, উদারতা ও সরলতারও প্রশংসা করেন কাসবেকর।
মিঠুন চক্রবর্তী নানাকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে স্মরণ করেছেন। পুনেতে তাঁর বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াতের কথা উল্লেখ করে মিঠুন বলেন, এত বড় অভিনেতা হয়েও নানা অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। অভিনেতা মুকেশ ঋষিও তাঁর সঙ্গে ‘কোহরাম’-এ কাজের স্মৃতি তুলে ধরে নানার শৃঙ্খলাবোধ, সময়ানুবর্তিতা এবং অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠার প্রশংসা করেন।
অভিনেতা মুকেশ খান্না ‘রাজা’ ছবির শুটিংয়ের একটি ঘটনা স্মরণ করে জানান, একটি দৃশ্য নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল। নানা পাটেকর এসে অভিনেতার দৃষ্টিকোণ থেকে দৃশ্যটি ব্যাখ্যা করে তাঁকে রাজি করান। মুকেশ খান্নার কথায়, এমন সংলাপ বলার দক্ষতা ও অভিনয় ক্ষমতার অভিনেতা আর পাওয়া যাবে না।
রাজপাল যাদবও নানার সঙ্গে কাটানো সময়ের একটি ভিডিও শেয়ার করে তাঁকে স্মরণ করেছেন। ‘ভানবাস’-এ ফের একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, নানার সরলতা ও উষ্ণতা তাঁর স্মৃতিতে চিরকাল থেকে যাবে।
নানা পাটেকরের দীর্ঘ অভিনয়জীবন ভারতীয় সিনেমার এক সমৃদ্ধ অধ্যায়। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বিশ্বনাথ পাটেকর ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় আত্মপ্রকাশ করেন। পরে ‘অঙ্কুশ’, ‘প্রতিঘাত’, ‘সালাম বম্বে!’, ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘অভয় চ্ছাপ্পান’, ‘অপরহণ’, ‘রাজনীতি’ এবং ‘ওয়েলকাম’-সহ একাধিক ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
‘পরিন্দা’ ছবিতে তাঁর অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। জীবনে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ২০১৩ সালে সিনেমা ও শিল্পকলায় অবদানের জন্য তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়।
মারাঠি সিনেমা ও থিয়েটারের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর। ‘সিংহাসন’, ‘নটসম্রাট’, ‘আপলা মানুষ’ এবং ‘ড. প্রকাশ বাবা আমটে: দ্য রিয়েল হিরো’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ২০১৬ সালের ‘নটসম্রাট’-এ গণপত বেলওয়ালকর চরিত্রে তাঁর অভিনয় মারাঠি সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি নানা পাটেকর পরিচালনাতেও হাত দেন। ১৯৯১ সালে ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবির মাধ্যমে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। চলচ্চিত্রের বাইরেও কৃষক ও খরায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই অভিনেতা।
শত্রুঘ্ন সিনহা তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল ও জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে স্মরণ করেছেন। তাঁর মতে, শক্তিশালী অভিনয় এবং তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মাধ্যমে নানা নিজের জন্য এক অনন্য জায়গা তৈরি করেছিলেন।
নানা পাটেকরের প্রয়াণে চলচ্চিত্র জগৎ হারাল এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ, এক শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী এবং এক অনন্য ব্যক্তিত্বকে। তাঁর অভিনীত চরিত্র, সংলাপ, চলচ্চিত্র ও মানুষের জন্য করা কাজ আগামী প্রজন্মের কাছেও তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।