আগরতলা, ৭ অক্টোবর: রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ৩ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) এবং পেনশনারদের ৩ শতাংশ ডিআর বৃদ্ধি, বিভিন্ন দপ্তরে নতুন শূন্যপদ সৃষ্টি, ত্রিপুরা স্টাফ সিলেকশন কমিশন গঠন, রেশন ব্যবস্থায় বিনামূল্যে চিনি-ময়দা-সুজি সরবরাহসহ মন্ত্রিসভার একাধিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাল প্রদেশ বিজেপি। বুধবার সাংবাদিক সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তগুলিকে রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন প্রদেশ বিজেপির মুখপাত্র সুব্রত চক্রবর্তী।
সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজ্যের অর্থনৈতিক বিকাশ ক্রমশ উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই উন্নয়নের পেছনে কৃষক, শিল্পোদ্যোগী, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং সরকারি কর্মচারীসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের অবদান রয়েছে। তাই সরকারি কর্মচারীদের প্রতিও রাজ্য সরকার সমানভাবে আন্তরিক।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বেতন এবং ডিএ-ডিআরের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। ২০১৮ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সেই ব্যবধান কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে রাজ্য সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার যখনই ডিএ বা ডিআর ঘোষণা করছে, রাজ্য সরকারও চেষ্টা করছে যাতে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কর্মচারী-পেনশনারদের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ কমিয়ে আনা যায়।
গতকালের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ৩ শতাংশ ডিএ এবং পেনশনারদের ৩ শতাংশ ডিআর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও পেনশনারদের ডিএ-ডিআর ৪১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬ শতাংশ হয়েছে।
শুধু ডিএ-ডিআর নয়, সরকারি কর্মচারীদের হাউস রেন্ট অ্যালাউন্সেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানান তিনি। এতদিন এইচআরএ ছিল ৮ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৩ হাজার টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে তা বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ সীমা ৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
সুব্রত চক্রবর্তীর দাবি, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পে ফিক্সেশনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে যেখানে ২.২৫ ফ্যাক্টর ছিল, তা বাড়িয়ে ২.৫৭ ফ্যাক্টর করা হয়। তাঁর বক্তব্য, কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবি ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করে সরকার ধারাবাহিকভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নতুন শূন্যপদ সৃষ্টির সিদ্ধান্তকেও বিশেষভাবে তুলে ধরেন বিজেপি মুখপাত্র। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক শিক্ষায় ৭০০টি, প্রাথমিক শিক্ষায় ১৪৫টি, আইন দপ্তরে গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি মিলিয়ে ৫৫টি, অর্থ দপ্তরে গ্রুপ-বি-র ১৪টি এবং সমাজকল্যাণ দপ্তরে ৫টি ব্লাইন্ড এডুকেটর পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।
এছাড়াও বুনিয়াদি শিক্ষার ক্ষেত্রে ৩১৩টি শূন্যপদ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বিজ্ঞান ও পরিবেশ দপ্তরেও আরটি করণিক ও গ্রুপ-সি পদ তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগরতলা পুর নিগমের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ২১৩টি শূন্যপদ এবং আইন দপ্তরে আরও ৬টি গ্রুপ-ডি পদ সৃষ্টির কথা জানান তিনি।
সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, ২০১৮ সালের পর থেকেই শূন্যপদ সৃষ্টি ও তা পূরণের প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে চলছে। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার নিয়মিত সরকারি কর্মসংস্থান হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এখানে চুক্তিভিত্তিক বা পার্টটাইম কর্মসংস্থানকে হিসেবের মধ্যে রাখা হয়নি।
সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, বর্তমানে আরও প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার শূন্যপদে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে, যা ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে।
অতীতে নিয়োগ বাতিল হওয়ার কারণে বহু বেকার যুবক সমস্যার মুখে পড়েছিলেন উল্লেখ করে সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, সেই ধরনের পরিস্থিতি যাতে ভবিষ্যতে তৈরি না হয়, সেজন্য সক্ষমতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দিকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই লক্ষ্যেই ত্রিপুরা স্টাফ সিলেকশন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, আগামী দিনে একাধিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা স্টাফ সিলেকশন কমিশনের মাধ্যমে পরিচালিত হলে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে, স্বচ্ছতা বজায় থাকবে এবং প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা সুযোগ পাবেন।
মন্ত্রিসভার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে রেশন ব্যবস্থায় পুজোর সময় বিনামূল্যে চিনি, ময়দা ও সুজি দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন বিজেপি মুখপাত্র।
তিনি বলেন, ত্রিপুরায় প্রায় ১০ লক্ষ রেশন কার্ড রয়েছে। ন্যায্য মূল্যের দোকানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে চাল, ডাল, চা-পাতা, সুজি, ময়দাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিপিএল ও অন্ত্যোদয় পরিবারের মানুষ যাতে কিছুটা স্বস্তি পান, সেদিকে সরকার বিশেষ নজর দিচ্ছে।
পুজো উপলক্ষে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের জন্য প্রতিটি রেশন কার্ডধারীকে বিনামূল্যে চিনি, ময়দা ও সুজি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, উৎসবের মরশুমে এই সিদ্ধান্ত দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কিছুটা হলেও আর্থিক স্বস্তি এনে দেবে।
রাজ্যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়নের কথাও সাংবাদিক সম্মেলনে তুলে ধরেন সুব্রত চক্রবর্তী। তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা. মানিক সাহার হাত ধরে রাজ্যের প্রথম হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। এর আগে রাজ্যে ডেন্টাল মেডিকেল কলেজ চালু হয়েছে। আগামী ১৩ অক্টোবর উদয়পুরে আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথাও জানান তিনি।
তাঁর দাবি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। ত্রিপুরাকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক হাব হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের ‘ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট’-এর কথাও তুলে ধরেন বিজেপি মুখপাত্র। কৃষক, শ্রমিক, দরিদ্র, শিল্পোদ্যোগী, স্বনির্ভর উদ্যোগী এবং মহিলাদের উন্নয়নকে সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর দাবি, ত্রিপুরায় বর্তমানে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার ‘লাখপতি দিদি’ তৈরি হয়েছে। মহিলাদের স্বনির্ভর করে তুলতে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।


















