নয়াদিল্লি, ৭ অক্টোবর (আইএএনএস): প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রধান হিসেবে টানা ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে একের পর এক অভিনন্দন ও প্রশংসা এসেছে। সার্বিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ থেকে শুরু করে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি, নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ টিনুবু, ডমিনিকার প্রধানমন্ত্রী রুজভেল্ট স্কেরিট, বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডি ওয়েভার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর গ্রেগ জিয়ানফোর্টে—সকলেই প্রধানমন্ত্রী মোদির দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের উত্থানের প্রশংসা করেছেন।
সার্বিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ভারতের মর্যাদা বিশ্বমঞ্চে ‘স্বর্গের উচ্চতায়’ তুলে নেওয়া নেতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নির্বাচনী প্রচারের একটি সম্প্রচারে ভুচিচ বলেন, মোদি ভারতকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন এবং তাঁর নেতৃত্বে দেশ ‘তুমুল সাফল্য’ অর্জন করেছে। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিপুল সাফল্য সত্ত্বেও বিদেশি শক্তির তরফে জনপ্রিয় নেতাদের দুর্বল করার চেষ্টা এখন একটি আন্তর্জাতিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রধানমন্ত্রী মোদিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ভুচিচ লেখেন, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী—টানা ২৫ বছর দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জনসেবায় নিয়োজিত থাকা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন এবং বিশ্ব দেখছে, তিনি ভারতকে কতটা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। মোদির সুস্বাস্থ্য, শক্তি ও সাফল্য কামনা করে ভুচিচ বলেন, ‘ভারত ভাগ্যবান যে মোদির মতো নেতা পেয়েছে।’
আফ্রিকান-আমেরিকান গায়িকা মেরি মিলবেনও প্রধানমন্ত্রী মোদির ২৫ বছরের জনসেবা উপলক্ষে তাঁকে ‘ভারতীয় স্বপ্নের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা’ বলে অভিহিত করেছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, মোদির রাজনৈতিক যাত্রা তরুণ ও প্রবীণ—সব প্রজন্মকেই বড় স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। দেশের কৃষক, সেনা, মহিলা, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়, প্রবীণ ও তরুণদের উন্নয়নে মোদির নেতৃত্বের প্রশংসা করেন তিনি।
মিলবেন বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এই দিনটিকে ভারতের সাফল্য ও নেতৃত্ব উদযাপনের দিন হিসেবে দেখা উচিত। বিজেপি ও কংগ্রেসের রাজনৈতিক বিভাজন দূরে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের অগ্রগতিকে উদযাপনের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর কথায়, ভারত গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সুযোগে সমৃদ্ধ একটি দেশ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদি সেই সুযোগকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর গ্রেগ জিয়ানফোর্টে আইএএনএস-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘অনুপ্রেরণাদায়ী বিশ্বনেতা’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, মোদির নেতৃত্ব গোটা বিশ্বের কাছে একটি উদাহরণ তৈরি করছে। ‘পাওয়ার উইদিন’ নামে মোদির নেতৃত্ব নিয়ে লেখা একটি বই পড়ার কথা উল্লেখ করে জিয়ানফোর্টে বলেন, কৃষিনির্ভর ভারত কীভাবে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের নেতৃত্ব এবং জি২০-তে প্রধানমন্ত্রী মোদির ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। তবে তাঁর মতে, বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়ার আগে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শক্ত ভিত তৈরি করা প্রয়োজন ছিল এবং মোদি সেই কাজ কার্যকরভাবে করেছেন।
ভারত সফররত মন্টানা গভর্নর একইসঙ্গে ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছরের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে সহ-পাইলটের হামলার মুখে দাঁড়িয়ে যাত্রীদের জীবন রক্ষা করে ওই পাইলট গোটা বিশ্বের সামনে সাহস ও নেতৃত্বের উদাহরণ তৈরি করেছেন।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে আরও ব্যক্তিগত ও আবেগঘন ভাষায় প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রশংসা করেছেন। তিনি মোদিকে নিজের ‘বড় ভাই’ এবং ‘গুরু’ হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি তাঁকে ভগবান বিষ্ণুর অবতার বলেও অভিহিত করেন। একটি মতামত নিবন্ধে তোবগে স্মরণ করেন, ২০১৯ সালে তিনি প্রথমবার মোদিকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে দেখার কথা বলেছিলেন। পরে দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, তাঁর সেই ধারণা ভুল ছিল না—বরং তিনি মোদির মধ্যে বিষ্ণুর ‘কল্কি অবতার’-এর বৈশিষ্ট্য দেখতে পান।
তোবগে বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ‘ভয়েস অব গ্লোবাল সাউথ’ সম্মেলন আয়োজন এবং আফ্রিকান ইউনিয়নকে জি২০-র স্থায়ী সদস্য করার ক্ষেত্রে মোদির ভূমিকারও প্রশংসা করেন তিনি। তাঁর মতে, ‘বিকশিত ভারত’ শুধু ভারতের জন্য নয়, ভুটানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত-ভুটান সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে তোবগে বলেন, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদি তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য ভুটানকে বেছে নিয়েছিলেন। দুই দেশের সম্পর্ককে ‘ভারত ফর ভুটান, ভুটান ফর ভারত’ বা ‘B4B’ কাঠামোর মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অংশীদারিত্ব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো, জলবিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, কৃষি ও শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। ভুটানের ১৩তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ভারতের ১০ হাজার কোটি টাকার সহায়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি প্রকল্পে ভারতের সহযোগিতার প্রশংসা করেন তোবগে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি প্রধানমন্ত্রী মোদির ২৫ বছরের নেতৃত্বকে ভারতের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ২০০১ সাল থেকে মোদি অসাধারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে ভারতীয় সমাজ ও দেশের উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের মর্যাদা নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। ভারত সফরের সময় মোদির উষ্ণ অভ্যর্থনার কথাও স্মরণ করেন তাকাইচি। ২০২৭ সালে ভারত-জাপান কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ টিনুবু প্রধানমন্ত্রী মোদির টানা ২৫ বছরের নেতৃত্বকে ‘যে কোনও গণতন্ত্রে বিরল অর্জন’ এবং ভারতীয় জনগণের আস্থার ‘শক্তিশালী প্রমাণ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মোদির জনসেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। গুজরাটের রূপান্তর থেকে শুরু করে ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম ও দ্রুততম বিকাশশীল অর্থনীতিগুলির অন্যতম হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন টিনুবু।
ডমিনিকার প্রধানমন্ত্রী রুজভেল্ট স্কেরিটও মোদিকে ২৫ বছরের জনসেবার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। দুই দেশের বন্ধুত্ব এবং ডমিনিকার জনগণের প্রতি ভারতের উদারতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী দিনেও ভারত-ডমিনিকা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশাবাদী।
বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডি ওয়েভারও প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ২৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন নেতৃত্বের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। গুজরাট থেকে নয়াদিল্লি পর্যন্ত মোদির রাজনৈতিক যাত্রার উল্লেখ করে তিনি ভারত-বেলজিয়াম সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সম্প্রতি তাঁর ভারত সফরকে ‘ফলপ্রসূ’ হিসেবে উল্লেখ করে ডি ওয়েভার প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, সেমিকন্ডাক্টর, ফিনটেক, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, শিক্ষা ও গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরেন।
উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মোদির টানা ২৫ বছরের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৪ সালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন এবং পরপর তিনটি লোকসভা নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠিত হয়েছে। বুধবার এই ঐতিহাসিক মাইলফলক পূর্ণ হওয়ার দিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাষ্ট্রনেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অভিনন্দন ও প্রশংসায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী মোদির দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
–আইএএনএস
























