আগরতলা, ৫ অক্টোবর: ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের ফলাফলে তিপ্রা মথার বড় জয়কে জনগণের আস্থার প্রতিফলন বলে দাবি করলেন দলের নেতা তথা মন্ত্রী বৃষকেতু দেববর্মা। সোমবার ফলাফল প্রকাশের দিন তিপ্রা মথার পক্ষ থেকে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানান, এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলে মোট ৩৪৭০টি আসনের মধ্যে তিপ্রা মথা ২৮০৩টি আসনে জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে সিপিআই(এম) মাত্র ৪০টি আসনে জয় পেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বৃষকেতু দেববর্মা বলেন, ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের ফলাফল অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং জনজাতি এলাকার মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান ও তিপ্রা মথার প্রতি তাঁদের আস্থারই প্রতিফলন। তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে দলের পক্ষ থেকে যে ধরনের জনসমর্থন দেখা গিয়েছিল, ফলাফলেও তার প্রতিফলন ঘটেছে।
তবে ফলাফল নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সিপিআই(এম) নেতা মানিক সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন বৃষকেতু দেববর্মা। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনী প্রচারে ত্রিপুরাসা জনজাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে মানিক সরকারের কিছু মন্তব্য জনজাতি মানুষের মনে আঘাত করেছে।
বৃষকেতুর দাবি, ত্রিপুরাসা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার উদ্যোগকে কটাক্ষ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ত্রিপুরাসাদের নৃত্য, গান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শুধু জনজাতি সমাজের সম্পদ নয়, ত্রিপুরার পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা এবং সংরক্ষণ করা সকলের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে জনজাতি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের যথাযথ উন্নয়ন ও প্রচারে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি বিভিন্ন ঐতিহাসিক নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। আগরতলার আস্তাবল ময়দানের নাম পরিবর্তন করে স্বামী বিবেকানন্দ ময়দান করার বিষয়টি উল্লেখ করে বৃষকেতু বলেন, স্বামী বিবেকানন্দকে তাঁরা শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু একইসঙ্গে ত্রিপুরার নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেও সম্মান করা প্রয়োজন।
এদিন জনজাতি সমাজের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘রিসা’ নিয়েও বক্তব্য রাখেন বৃষকেতু দেববর্মা। তাঁর অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ত্রিপুরায় এসে রিসা পরিধান করে জনজাতি সংস্কৃতিকে সম্মান জানালেও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার তা করেননি। একইসঙ্গে ককবরক ভাষা নিয়েও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বৃষকেতু বলেন, জনজাতি সমাজের প্রতি কোনও ধরনের অবহেলা বা নেতিবাচক মনোভাব থাকলে তার প্রতিফলন নির্বাচনের ফলাফলেও পড়তে পারে। তাঁর দাবি, এবারের ফলাফল সেই রাজনৈতিক বার্তাই স্পষ্ট করেছে।
আগামী দিনের নির্বাচন নিয়েও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন তিপ্রা মথার এই নেতা। তিনি বলেন, আগামী ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও তিপ্রা মথা ভালো ফল করবে। পাশাপাশি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সম্ভাব্য আগরতলা পুর নিগম নির্বাচনেও দলের শক্তি আরও স্পষ্ট হবে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিন ভিলেজ কমিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পেছনে তিপ্রা মথার দীর্ঘ আন্দোলনের কথাও তুলে ধরেন বৃষকেতু দেববর্মা। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ভিলেজ কমিটি নির্বাচন আয়োজনের জন্য আন্দোলন করেছে তিপ্রা মথা। হাইকোর্ট এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে অবশেষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত টিটিএডিসি নির্বাচনের ফলাফলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ২৮টি আসনের মধ্যে ২৪টিতে তিপ্রা মথার জয় হয়েছিল। ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের ফলাফলকে সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন বলে দাবি করেন তিনি। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পেছনে প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মার ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন বৃষকেতু।
তবে নির্বাচনে জয়কেই তিপ্রা মথার চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখতে নারাজ বৃষকেতু দেববর্মা। তাঁর কথায়, “শুধু নির্বাচনে জয়ী হলেই সাফল্য নয়। জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেই প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণ করতে পারলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে।” আগামী দিনে জনজাতি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই দলের মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
একইসঙ্গে ভোটগণনাকে কেন্দ্র করে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান বৃষকেতু। তাঁর দাবি, তিপ্রা মথা বরাবরই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের পক্ষে। ভোটগণনার দিনেও দলের পক্ষ থেকে কর্মী-সমর্থকদের সংযত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, দলের নেতা প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মাও সামাজিক মাধ্যমে লাইভ করে সাধারণ মানুষের কাছে শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর মতে, জনগণ সেই আবেদনকে সম্মান করেই ভোটগণনার সময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সহযোগিতা করছেন।
সবশেষে ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে তিপ্রা মথার জয়কে দলের নয়, জনগণের জয় হিসেবে তুলে ধরেন বৃষকেতু দেববর্মা। তাঁর বক্তব্য, “জনগণ তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। এই জয় তিপ্রা মথার নয়, জনগণের জয়।” আগামী দিনে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের মাধ্যমে সেই আস্থার মর্যাদা রাখাই দলের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বলে জানান তিনি।



















