নয়াদিল্লি, ১২ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): সদস্য দেশগুলির মধ্যে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ‘বড় কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে ব্রিকসের যৌথ বিবৃতিতে ঐকমত্যে পৌঁছল সদস্য দেশগুলি। শনিবার নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনেই এই যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ার কথা।
সূত্রের খবর, প্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানগুলির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে ঐকমত্যে পৌঁছতে ভারত শুক্রবার থেকে শনিবার ভোর ৪টা পর্যন্ত ধারাবাহিক আলোচনা ও নিবিড় কূটনৈতিক দর-কষাকষি চালায়।
এক সূত্র জানায়, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয়ে সদস্য দেশগুলির মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। ভারত ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা চালায়। ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী একই ব্রিকস মঞ্চে থাকা সত্ত্বেও একাধিক আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে তাদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে এই পরিস্থিতিতে ঐকমত্যে পৌঁছনোর বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত এবং ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো দেশগুলির মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা ছিল অত্যন্ত জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতায় সেই মতপার্থক্য ব্রিকসের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত সদস্য দেশগুলি যৌথ বিবৃতিতে ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে সূত্রের দাবি।
চলমান বিশ্বব্যাপী সংঘাতের মধ্যেও নয়াদিল্লি ব্রিকসের অচলাবস্থা কাটিয়ে ঐকমত্য তৈরিতে সফল হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বের প্রশংসা করেছেন।
এর আগে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হওয়ার পর গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের মন্ত্রিসভা পর্যায়ের বৈঠক জোটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনও প্রচলিত যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল। গভীর মতপার্থক্যের কারণে সদস্য দেশগুলির মধ্যে ঐকমত্য তৈরি না হওয়ায় ভারত সেবার শুধুমাত্র ‘চেয়ার্স স্টেটমেন্ট’ এবং ‘আউটকাম ডকুমেন্ট’ প্রকাশ করেছিল।
এদিকে, ভারত ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বরাবরই সংঘাতের সমাধানে আলোচনা ও কূটনীতির ওপর জোর দিয়ে এসেছেন। একই সঙ্গে ভারত স্পষ্ট করেছে, এটি যুদ্ধের যুগ নয় এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কোনও সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসবে না।
জি২০-র সভাপতিত্বের সময়ের মতো এবারও ব্রিকসের সভাপতি দেশ হিসেবে ভারত ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর স্বার্থকে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। একইসঙ্গে ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী মঞ্চে পরিণত না করার ক্ষেত্রেও নয়াদিল্লি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছে।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ‘দ্য ইন্টারপ্রেটার’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিকসই ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার ক্ষেত্র। জোটের সম্প্রসারণ, যার বিরোধিতা ভারত ও ব্রাজিল উভয়েই করেছিল, ঐকমত্য তৈরির কাজ আরও কঠিন করে তুলেছে। বৃহত্তর সদস্যপদের আড়ালে ভারত ও ব্রাজিল মূলত ব্রিকসকে অর্থনৈতিক মঞ্চ হিসেবে দেখলেও চিন ও রাশিয়া এটিকে ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে দেখে—এমন বিভাজনও রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারত নিজেকে সংশোধনবাদী নয়, বরং সংস্কারপন্থী শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় বৃহত্তর ভূমিকা, রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ এবং আর্থিক ও প্রযুক্তিগত নীতি নির্ধারণে আরও বেশি প্রভাবের পক্ষে সওয়াল করে নয়াদিল্লি। ভারতের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কিছু অংশে পরিবর্তন আনা, তবে এমন একটি ব্যবস্থাকে ধরে রাখা, যা দেশের নিজস্ব উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আইএএনএস



















