জয়পুর, ৩ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): রাজস্থানের নির্বাচনী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় আনুগত্য, জাতপাতের সমীকরণ, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। তবে পুরসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন এক রাজনৈতিক প্রবণতা নজরে আসছে। বিজেপি ও কংগ্রেস—দুই দলের বিরুদ্ধেই উচ্চবর্ণের একাংশের মধ্যে প্রকাশ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
কোথাও প্রার্থী বাছাই নিয়ে ক্ষোভ গড়িয়েছে বিক্ষোভে, কোথাও হয়েছে সম্প্রদায়ভিত্তিক বৈঠক ও বাইক র্যালি। আবার কোথাও দলীয় প্রার্থীদের বদলে নির্দল প্রার্থীদের সমর্থনের ডাক দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পছন্দ কি এবার একইভাবে বজায় থাকবে?
যদিও এই অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত ভোটে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে পুরভোটের আগে এই ধরনের প্রকাশ্য রাজনৈতিক সক্রিয়তা রাজস্থানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রার্থী বাছাইকে কেন্দ্র করে আবু রোডে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিজেপি ও কংগ্রেস—উভয় দলের বিরুদ্ধেই বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। ব্রহ্মপুরী কলোনির পরশুরাম ভবনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, দুই দলের প্রতি দীর্ঘদিনের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও প্রার্থী তালিকায় সম্প্রদায়টি যথাযথ প্রতিনিধিত্ব পায়নি।
স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁরা টিকিট বণ্টন প্রক্রিয়ার তদন্তের দাবি জানান এবং বিজেপির জেলা সভাপতি রক্ষা ভান্ডারি ও কংগ্রেসের জেলা সভাপতি লীলারামকে সরানোর দাবিও তোলেন। অর্থাৎ তাঁদের অভিযোগ শুধু নির্দিষ্ট কোনও প্রার্থীকে ঘিরে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও স্বীকৃতির বৃহত্তর প্রশ্নকে সামনে রেখে।
গঙ্গাপুর সিটিতে আবার ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। উচ্চবর্ণের একাংশের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠন বিজেপি বা কংগ্রেসের পরিবর্তে নির্দল প্রার্থীদের সমর্থনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
বুধবার ওয়ার্ড ৩০-এর হনুমান মন্দির থেকে একটি বাইক র্যালি বের হয়। তার আগে সমবেতভাবে হনুমান চালিশা পাঠ করা হয়। পরে মূল বাজার হয়ে র্যালিটি ওয়ার্ড ৩৫-এর কমিটি অফিসের দিকে যায়। একইসঙ্গে ইউজিসি-সহ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দাবিও তুলে ধরা হয়।
সম্প্রদায়ের মুখপাত্র বেদপ্রকাশ মঙ্গলের দাবি, বিভিন্ন ওয়ার্ডের ৩০টিরও বেশি নির্দল প্রার্থী তাঁদের সমর্থনের জন্য কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আবেদন নেওয়া হবে এবং শুক্রবার কোন প্রার্থীদের সমর্থন করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।
সংগঠনটি জানিয়েছে, নির্বাচিত নির্দল প্রার্থীদের সমর্থনে পথসভা, র্যালি এবং অন্যান্য জনসংযোগ কর্মসূচি চালানো হবে। এই কৌশল সফল হলে ঘনিষ্ঠ লড়াইয়ের ওয়ার্ডগুলিতে বিজেপি ও কংগ্রেসের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। কারণ ভোট এক দল থেকে অন্য দলে সম্পূর্ণ স্থানান্তরিত না হয়ে একাধিক নির্দল প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে যেতে পারে।
এই অসন্তোষকে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগও দেখা গেছে। শ্রী রাজপুত করণী সেনার জাতীয় সভাপতি মহিপাল সিং মাকরানা বিকানেরে বিজেপি ও কংগ্রেস বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন। উচ্চবর্ণের সম্প্রদায়কে নিজেদের ভোটের শক্তি প্রদর্শনেরও ডাক দিয়েছেন তিনি।
মাকরানার হস্তক্ষেপে স্থানীয় টিকিট বণ্টন নিয়ে ক্ষোভ বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইউজিসি-সংক্রান্ত দাবিকে ঘিরে আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা জানিয়ে তিনি সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
ইউজিসি আইন, এসসি/এসটি আইন এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করেও রাজস্থানে উচ্চবর্ণের একাংশের মধ্যে আন্দোলন চলছে। তবে এই দাবিগুলি নির্দিষ্ট কিছু সংগঠন ও গোষ্ঠীর বক্তব্য; এগুলিকে রাজ্যের সমগ্র উচ্চবর্ণের মানুষের মতামত হিসেবে দেখা যায় না।
পুরভোটের ফলেই বোঝা যাবে এই অসন্তোষ কতটা ভোটে প্রতিফলিত হয়। বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় পুরভোটের পরিসর ছোট হলেও রাজনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব রয়েছে। কারণ কাউন্সিলর নির্বাচন ওয়ার্ডভিত্তিক হওয়ায় স্থানীয় জাতপাতের সমীকরণ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রার্থীর জনপ্রিয়তা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠনের প্রভাব সরাসরি ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
কোনও কোনও ওয়ার্ডে কয়েকশো ভোটের ব্যবধানেই ফল নির্ধারিত হতে পারে। ফলে সংগঠিতভাবে কোনও সম্প্রদায়ের ভোট নির্দল প্রার্থীদের দিকে সরে গেলে বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়কেই ত্রিমুখী লড়াইয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে দেখার দুটি দিক রয়েছে। একদিকে, এটি সাধারণ নির্বাচনী প্রবণতাও হতে পারে—টিকিট না পাওয়া প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের ক্ষোভ, নির্বাচনের আগে সম্প্রদায়ভিত্তিক বিক্ষোভ এবং ভোটের পর সেই ক্ষোভের অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে, এই বিক্ষোভ যদি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে গভীর অসন্তোষের প্রতিফলন হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের ভোটের আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে এমন কোনও প্রমাণ নেই যে রাজ্যজুড়ে উচ্চবর্ণের ভোটারদের মধ্যে বিজেপি বা কংগ্রেসের সমর্থনে বড় ধরনের ধস নেমেছে। একইভাবে নির্দল প্রার্থীরা এই জনমোবিলাইজেশনকে নির্বাচনী সাফল্যে পরিণত করতে পারবেন কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
তবু ব্যক্তিগত ক্ষোভের পরিসর পেরিয়ে বিষয়টি যখন প্রকাশ্য বিক্ষোভ, সংগঠিত কর্মসূচি এবং নির্দল প্রার্থীদের সমর্থনের আহ্বানে পৌঁছেছে, তখন তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। রাজস্থানে বিজেপি ও কংগ্রেস এখনও প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি এবং উভয়েরই শক্তিশালী সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। ফলে রাতারাতি এই পরিস্থিতি রাজ্যের রাজনৈতিক চিত্র বদলে দেবে, এমন সম্ভাবনা এখনই নেই।
তবে কয়েকটি ওয়ার্ডে সম্প্রদায়ভিত্তিক অসন্তোষের কারণে ফলাফল বদলে গেলেও নির্বাচনের সামগ্রিক রাজনৈতিক বার্তায় তার প্রভাব পড়তে পারে। আপাতত বিক্ষোভকারীদের বার্তা স্পষ্ট—প্রথাগত রাজনৈতিক সমর্থনকে আর নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া যাবে না। সেই বার্তা সত্যিকারের ভোটবদলে পরিণত হয়, নাকি নির্বাচনী মরসুমের ক্ষোভ হিসেবেই থেকে যায়, তার উত্তর মিলবে ব্যালট বাক্সেই।
—আইএএনএস



















