আগরতলা, ২২ আগস্ট : রেগুলেটরি গ্যাপ কমানোর নামে সরকার জনগণের উপর অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। একসময় যে বিদ্যুৎ নিগমের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট ছিল, বর্তমানে সেই সংস্থাই প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতিতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে রাজ্যের নিজস্ব সক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে বাইরে থেকে বিদ্যুৎ কেনার উপর নির্ভরতা বেড়েছে। আজ সাংবাদিক সম্মেলনে এমনটাই অভিযোগ তুলেছেন প্রাক্তন বিদ্যুৎমন্ত্রী তথা সিপিআই(এম) নেতা মানিক দে।
এদিন মানিক দে বলেন, একসময় ত্রিপুরা লোডশেডিংমুক্ত রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। অথচ বর্তমানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জেরে পানীয় জলের সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ফলে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার কথা বলা হলেও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
তাঁর কথায়, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের কারণে রাজ্যের মানুষ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন। জনগণের আন্দোলনের ফলেই সরকার কিছুটা জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। বিদ্যুতের বাড়তি বিল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবেই সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
মানিক দে’র দাবি, বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে রাজ্যে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বড়মুড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪২ মেগাওয়াট এবং রুখিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৬২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে ওই উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। তাঁর দাবি, এখন বড়মুড়া থেকে মাত্র প্রায় ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এই উৎপাদন ঘাটতির ফলেই রাজ্যের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
তাঁর অভিযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে রাজ্যের নিজস্ব সক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে বাইরে থেকে বিদ্যুৎ কেনার উপর নির্ভরতা বেড়েছে। আর তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের উপর অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের বোঝা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন বিদ্যুৎ আইন ও নীতির সমালোচনা করে মানিক দে বলেন, এর ফলে ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি কর্পোরেশন লিমিটেডসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা সমস্যার মুখে পড়েছে। তাঁর অভিযোগ, সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে বেসরকারি সংস্থাগুলির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তি ও সংস্কারের নামে বিদ্যুৎ পরিষেবার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
স্মার্ট মিটার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মানিক দে। তাঁর দাবি, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পরীক্ষামূলকভাবে রাজ্যে প্রায় ৫০ হাজার স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছিল। সেই সময়ে মিটার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের অভিযোগ তৈরি হয়নি এবং অস্বাভাবিক রিডিং আসার ঘটনাও সামনে আসেনি। কারণ, তখন সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে স্মার্ট মিটার বসানোর ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। মানিক দে’র অভিযোগ, স্মার্ট মিটারের নামে প্রযুক্তির ব্যবহারকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, আগে পরীক্ষামূলকভাবে স্মার্ট মিটার বসানোর সময় যদি বড় ধরনের সমস্যা না হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে স্মার্ট মিটার নিয়ে কেন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষকে রাস্তায় নামতে হচ্ছে?
তাঁর অভিযোগ, ‘রেগুলেটরি গ্যাপ’ কমানোর যুক্তিকে সামনে রেখে রাজ্য সরকার সাধারণ মানুষের উপর অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। মানিক দে’র দাবি, বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ত্রিপুরা বিদ্যুৎ নিগমের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট ছিল। বর্তমানে সেই সংস্থার প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি দেখানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। কীভাবে একটি সরকারি বিদ্যুৎ সংস্থা এই বিপুল আর্থিক ঘাটতির মুখে পড়ল, তা নিয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন তিনি।
মানিক দে’র বক্তব্য, একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিজস্ব সক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ পরিষেবায় ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটছে এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল। শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানো বা সাময়িক সিদ্ধান্ত নেওয়াই যথেষ্ট নয়। রাজ্যের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ নিগমের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। মানিক দে’র অভিযোগ, সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনার কারণে একসময় বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে যে স্বনির্ভরতার দিকে ত্রিপুরা এগিয়েছিল, বর্তমানে সেই জায়গা থেকে রাজ্য পিছিয়ে যাচ্ছে।



















