তিরুবনন্তপুরম, ১০ আগস্ট (আইএএনএস): সাধারণত কোনও রাজনৈতিক দলের জন্য তিন মাস সময় যথেষ্ট—পরাজয়ের ধাক্কা সামলে উঠে পরবর্তী লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করার জন্য। কিন্তু কেরলের সিপিআই(এম)-এর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি যেন এখনও তেমন নয়। বিধানসভা নির্বাচনে কীভাবে নিশ্চিত জয়ের প্রত্যাশা এত বড় বিপর্যয়ে পরিণত হল, তা এখনও পর্যালোচনা করছে দলের কেরল নেতৃত্ব।
পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন বাম শিবির বিধানসভা নির্বাচনে ইতিহাস বদলে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নেমেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটাররাই পাল্টে দিলেন সেই রাজনৈতিক চিত্রনাট্য। ১৪০ আসনের বিধানসভায় শক্তিশালী ৯৯ আসন থেকে এলডিএফ নেমে এল মাত্র ৩৫ আসনে।
অন্যদিকে, ২০২১ সালের নির্বাচনে বিধানসভা থেকে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পর বিজেপি এবার তিনটি আসন নিয়ে ফের বিধানসভায় প্রবেশ করেছে।
তবে সিপিআই(এম)-এর অস্বস্তির মূল কারণ শুধু আসনসংখ্যার এই বিপর্যয় নয়। দলের অস্বস্তি আরও গভীর হয়েছে দলের অন্দরেই।
সিপিআই(এম)-এর তিন প্রবীণ নেতা এবার নিজেদের আসন ধরে রাখতে সক্ষম হন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ তাঁদের বিরুদ্ধে প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাঁদের জয় অনেকটাই সহজ হয়। এই তিন জয়ের মধ্যে দু’টি এসেছে কান্নুর থেকে—যা স্বয়ং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সেই ফলাফলই হয়তো প্রথম ইঙ্গিত দেয় যে এতদিনের শক্তিশালী রাজনৈতিক দুর্গের দেওয়ালে ফাটল ধরতে শুরু করেছে।
এরপর থেকেই রাজ্য নেতৃত্ব পরাজয়ের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এবার প্রশ্ন শুধু রাজ্য কমিটির ঘরেই সীমাবদ্ধ নেই। দলের জাতীয় নেতৃত্বও নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। সাধারণ সম্পাদক এম.এ. বেবি-সহ শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, পর্যালোচনার সময় পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বছরের পর বছর দলের অভ্যন্তরে বিজয়নের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা কার্যত কঠিন ছিল। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফল সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এবার তাঁর নেতৃত্বও পর্যালোচনার আওতায় আসছে।
তবে বিজয়ন শিবিরও নীরব নেই। দলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারযন্ত্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী ভি.ডি. সতীশনের সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ, বন্যা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন বিতর্ককে সামনে এনে নতুন সরকারের সমালোচনা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি বিজয়নকে ঘিরে পুরনো নস্টালজিয়াও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে—‘‘শুধু বিজয়ন যদি এখনও ক্ষমতায় থাকতেন…’’—এই বার্তাকে সামনে রেখে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতাগুলিকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে তাঁর শিবির।
আগামী মাসে সিপিআই(এম)-এর তিন দিনের বর্ধিত রাজ্য কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা। সেখানে নির্বাচনী বিপর্যয়ের বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে। ফলে এই বৈঠককে ঘিরে দলের অভ্যন্তরে প্রত্যাশা এবং জল্পনা দু’টিই বাড়ছে।
এখন বড় প্রশ্ন শুধু নির্বাচনী পরাজয়ের পর্যালোচনা হবে কি না, তা নয়। আসল প্রশ্ন হল—সেই পর্যালোচনায় কি পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বও খতিয়ে দেখা হবে?
একসময় যাঁকে দলের রাজনীতিতে কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করা হতো, তাঁর জন্য সম্ভবত এটাই এখন সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
—আইএএনএস



















