নয়াদিল্লি, ৭ আগস্ট (আইএএনএস): ই-কোর্টস মিশন মোড প্রকল্প ভারতের কাগজ-নির্ভর বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটাল, স্বচ্ছ এবং সহজে অনুসরণযোগ্য বিচার পরিষেবা ব্যবস্থায় রূপান্তর করেছে। ২০১৪ সাল থেকে দেশে মামলার দায়ের ও নিষ্পত্তির সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। একইসঙ্গে প্রতি বছর আদালতগুলিতে দায়ের হওয়া মামলার তুলনায় নিষ্পত্তি হওয়া মামলার সংখ্যা বেশি থাকছে বলে শুক্রবার প্রকাশিত সরকারি তথ্যপত্রে জানানো হয়েছে।
তথ্যপত্র অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই আদালতের ৭৫৩ কোটিরও বেশি পৃষ্ঠা ডিজিটাল আকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, হাজার হাজার ই-সেবা কেন্দ্র সাধারণ মানুষকে বিচার পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই উদ্যোগগুলির ফলে বিচার ব্যবস্থা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং সকলের কাছে সহজলভ্য হচ্ছে।
একশো কোটিরও বেশি মানুষের বিচার পরিষেবার দায়িত্বে থাকা ভারতের আদালত ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে কাগজের নথি এবং প্রচলিত পরিকাঠামোর উপর নির্ভরশীল ছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষকে মামলা সংক্রান্ত কাজ, নথি সংগ্রহ বা শুনানির জন্য আদালতে বারবার যাতায়াত করতে হতো এবং অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হতো।
এই পুরনো ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতেই ই-কোর্টস মিশন মোড প্রকল্প চালু করা হয়। বর্তমানে প্রকল্পটি তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে।
প্রথম পর্যায় (২০১১-২০১৫):
এই পর্যায়ে ১৪ হাজারের বেশি আদালতকে কম্পিউটারাইজড করা হয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিচার পরিষেবার জন্য প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক পরিকাঠামো তৈরি করা হয়।
দ্বিতীয় পর্যায় (২০১৫-২০২৩):
এই পর্যায়ে নাগরিককেন্দ্রিক একাধিক পরিষেবা চালু করা হয়। এর মধ্যে ছিল ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ডেটা গ্রিড (এনজেডিজি), ই-ফাইলিং এবং ই-সেবা কেন্দ্র। পাশাপাশি, ভিডিও কনফারেন্সিং পরিকাঠামো পাঁচ গুণেরও বেশি বাড়ানো হয়, যার ফলে ভার্চুয়াল শুনানির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয় পর্যায় (২০২৩-২০২৭):
বর্তমান পর্যায়ে লক্ষ্য হল সম্পূর্ণ ডিজিটাল, কাগজবিহীন এবং আরও আধুনিক আদালত ব্যবস্থা তৈরি করা। এর মধ্যে রয়েছে বৃহৎ পরিসরে নথি ডিজিটাইজেশন, ভার্চুয়াল শুনানির সম্প্রসারণ, বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অ্যানালিটিক্স ও অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (ওসিআর)-এর মতো প্রযুক্তির ব্যবহার।
আগে অভিযোগপত্র, লিখিত বক্তব্য, জবাব এবং অন্যান্য আবেদন জমা দিতে নাগরিক ও আইনজীবীদের আদালতে সরাসরি যেতে হতো। ই-ফাইলিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন যে কোনও জায়গা থেকে অনলাইনে নথি জমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বিচার পরিষেবাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ইংরেজির পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষাতেও এই পরিষেবা চালু রয়েছে এবং এটি জেলা আদালত, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে কার্যকর।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ই-ফাইলিং ব্যবস্থায় অনলাইন পেমেন্ট, অনলাইনে ভকালতনামা জমা এবং ই-সইয়ের সুবিধা রয়েছে। চালুর পর থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ১.২৫ কোটিরও বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। একই সময়ে ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে আদালত ফি বাবদ ১,৪০৪ কোটি টাকা এবং জরিমানা বাবদ ৭৫ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।
তৃতীয় পর্যায়ে পুরনো আদালতের কোটি কোটি নথিও ডিজিটাল করা হচ্ছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ নথি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমছে এবং দ্রুত অনুসন্ধান ও ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ভিডিও কনফারেন্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন মামলাকারী, আইনজীবী, সাক্ষী এবং অন্যান্য পক্ষ দূর থেকেই শুনানিতে অংশ নিতে পারছেন। এর ফলে যাতায়াতের প্রয়োজন কমেছে এবং বিভিন্ন রাজ্য ও শহরের মানুষের জন্য বিচার পাওয়ার সুযোগ সহজ হয়েছে।
দেশজুড়ে আদালত, জেল ও হাসপাতাল মিলিয়ে ৭,৫৫৩টি প্রতিষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সিং সুবিধা চালু হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আদালতগুলি ইতিমধ্যেই ৪.১৮ কোটিরও বেশি দূরবর্তী শুনানি সম্পন্ন করেছে।
১১টি হাইকোর্টে আদালতের কার্যক্রমের সরাসরি সম্প্রচার (লাইভস্ট্রিমিং) চালু হয়েছে। পাশাপাশি, ট্রাফিক চালান সংক্রান্ত অনলাইন নিষ্পত্তির জন্য ৩১টি ভার্চুয়াল কোর্ট স্থাপন করা হয়েছে। এই ভার্চুয়াল কোর্টগুলিতে ১১.৩৩ কোটি চালান এসেছে, যার আর্থিক পরিমাণ ১,১৩৫.৭৯ কোটি টাকা।
২০২৪ সালে ইন্টার-অপারেবল ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের অধীনে চালু হওয়া ‘ন্যায় শ্রুতি’ ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিযুক্ত, সাক্ষী, পুলিশ আধিকারিক, সরকারি আইনজীবী, বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞ এবং বন্দিরা ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি হাজিরা ও সাক্ষ্য দিতে পারছেন। এর ফলে সময় ও সম্পদের সাশ্রয় হচ্ছে এবং মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে সহায়তা করছে।



















