আগরতলা, ২০ জুলাই: ডিউটিরত অবস্থায় ত্রিপুরা পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজিপি) অনুরাগ ধনকরের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে শোকের পাশাপাশি তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে হাসপাতালে ছুটে যান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এবং বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তাঁরা রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন এবং ঘটনার বিচার বিভাগীয় ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। এদিকে বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, তিনি এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে জিবি পন্ত হাসপাতালে প্রয়াত ডিজিপির মরদেহের কাছে গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দেওয়া হয়নি। জেলাশাসক ড. বিশাল কুমার তাদেরকে বাঁধা দান করেন।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বলেন, রাজ্যের পুলিশের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন আধিকারিকের ডিউটিরত অবস্থায় মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং উদ্বেগজনক। তাঁর দাবি, এই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে হবে, তা নিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এদিকে মরদেহের কাছে যেতে বাধা দেওয়ার প্রসঙ্গে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বিরোধী দলনেতা বলেন, তাঁদের মরদেহের কাছে যেতে না দেওয়াই ডিজিপির মৃত্যুকে ঘিরে একাধিক গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তাঁর দাবি, এই ঘটনায় মনে হচ্ছে এটি “স্বাভাবিক মৃত্যু নয়” এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত।
মানিক সরকার অভিযোগ করেন, রাজ্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে এবং মানুষের ভোটাধিকার খর্ব করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি রাজ্যের কর্মসংস্থান ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, বহু মানুষ কাজের অভাবে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। তাঁর বক্তব্য, যে রাজ্যে একজন পুলিশের মহাপরিচালককেও নিজের জীবন দিতে হয়, সেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। এই পরিস্থিতির জন্য তিনি বিজেপি সরকারের শাসনব্যবস্থাকেই দায়ী করেন।
অন্যদিকে, বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরীও অনুরাগ ধনকরের মৃত্যুকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অনুরাগ ধনকরের মতো সৎ, দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ আধিকারিক রাজ্যে খুব কমই এসেছেন। তাঁর মতো একজন আধিকারিককে কেন এমন পরিণতির মুখে পড়তে হল, তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই ঘটনার জন্যও তিনি রাজ্যের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং শাসকদলের ভূমিকার সমালোচনা করেন।
জিতেন্দ্র চৌধুরী ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার নেপথ্যের সমস্ত বিষয় জনসমক্ষে আসা উচিত। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ডিজিপির ছেলে না আসা পর্যন্ত মরদেহ সংরক্ষণ করে রাখা হোক।
এ সময় তিনি আরও অভিযোগ করেন, জেলাশাসক ড. বিশাল কুমারের নেতৃত্বে প্রশাসন মরদেহ দ্রুত ময়নাতদন্তে পাঠানোর চেষ্টা করছে। তাঁর প্রশ্ন, কেন এত তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে এবং বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের এই তৎপরতার কারণ কী? তাঁর অভিযোগ, মরদেহ নিয়ে “লুকোচুরি” করা হচ্ছে, যা জনমনে আরও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, বিরোধী দলনেতা এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডিজিপিকে দেখতে হাসপাতালের ভেতরে গেলে সেখানে জেলাশাসক ডঃ বিশাল কুমার তাদেরকে বাইরে বেরিয়ে যেতে বলেন। ফলে সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এই ঘটনারও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিরোধী দলনেতা।
বিরোধী দলনেতার বক্তব্য, যে রাজ্যে পুলিশের সর্বোচ্চ পদস্থ আধিকারিকও নিরাপদ নন এবং ডিউটিরত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা সহজেই অনুমেয়। তিনি গোটা ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আনার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, ডিজিপি অনুরাগ ধনকরের মৃত্যুর ঘটনায় এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিতভাবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেলেও, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে চাপানউতোর ক্রমশ বাড়ছে। তদন্তের মাধ্যমেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সমস্ত দিক স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।























