ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি : ‘অ্যান্টি-আমেরিকান’ ব্রিকস সমর্থনকারী দেশগুলোর ওপর চাপবে ১০% অতিরিক্ত শুল্ক

ওয়াশিংটন, ৭ জুলাই : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ব্রিকস জোটের ‘অ্যান্টি-আমেরিকান’ নীতিতে সমর্থন দিলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছেন, যে দেশ ব্রিকস-এর অ্যান্টি-আমেরিকান নীতিতে নিজেদের যুক্ত করবে, তাদের ওপর অতিরিক্ত ১০% শুল্ক আরোপ করা হবে। এই নীতিতে কোনো ব্যতিক্রম থাকবে না। ট্রাম্প তার পোস্টে ‘অ্যান্টি-আমেরিকান’ নীতির সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। তবে তিনি জানান, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সোমবার থেকেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো শুরু হবে।

ট্রাম্পের এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই রিও ডি জেনেইরোতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে জোটের নেতারা মার্কিন একতরফা শুল্ক নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে বলা হয়, বাণিজ্য-বিধিবহির্ভূত ও একতরফা শুল্ক ব্যবস্থা বৈশ্বিক বাণিজ্যকে ব্যাহত করছে, সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যস্ত করছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

ব্রিকস সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে ১১ সদস্যের জোট, ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়াও ইরান, মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এতে যুক্ত হয়েছে। জোটটি বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং মোট জিডিপির ৪০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে।

জোটের নেতারা বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন একতরফা অবস্থানের বিরোধিতা করে ডব্লিউটিও-ভিত্তিক ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেন। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে বেশ কিছু দেশে উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে, যা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই নতুন শুল্ক হুমকি বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১০% অতিরিক্ত শুল্কের সিদ্ধান্তের পেছনে কয়েকটি মূল কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প বারবার বলেছেন, বাড়তি শুল্ক আরোপের মাধ্যমে তিনি মার্কিন শিল্প ও উৎপাদন খাতকে রক্ষা করতে চান। তার যুক্তি, এতে বিদেশে বিনিয়োগ করা মার্কিন কোম্পানিগুলো দেশে ফিরে এসে উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত হবে, ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

ব্রিকস-এর মতো জোট, যারা ট্রাম্পের ভাষায় ‘অ্যান্টি-আমেরিকান’ নীতিতে যুক্ত হচ্ছে, তাদের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি আসলে একটি কূটনৈতিক চাপের কৌশল। এর মাধ্যমে তিনি এসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করতে বা মার্কিন স্বার্থের প্রতি নমনীয় হতে বাধ্য করতে চাইছেন।

ট্রাম্প মনে করেন, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়বে এবং এতে দেশীয় পণ্যের চাহিদা বাড়বে। ফলে আমেরিকার উৎপাদকরা লাভবান হবে এবং বৈদেশিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।

ট্রাম্প অতীতে শুল্ক আরোপের পেছনে অবৈধ অভিবাসন এবং ফেন্টানাইলের মতো মাদক প্রবাহ রোধের যুক্তিও দেখিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর শুল্কের চাপ বাড়ালে এসব সমস্যা মোকাবিলায় সুবিধা হবে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, অতিরিক্ত শুল্কের ফলে শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদের ওপরই চাপ বাড়বে, কারণ এতে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।

ব্রিকস নেতারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই শুল্ক নীতি বেআইনি, একতরফা এবং বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার নিয়মের পরিপন্থী। রিও ডি জেনেইরোতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে নেতারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের এই ধরনের শুল্ক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত করছে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

তারা আরও বলেন, একতরফা শুল্ক আরোপের ফলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়ছে এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্রিকস নেতারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মভিত্তিক ও ন্যায্য বাণিজ্য ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং ট্রাম্পের শুল্ক নীতিকে ‘অবৈধ ও স্বেচ্ছাচারী’ বলে অভিহিত করেছেন।

এছাড়া, এই শুল্ক নীতির কারণে ছোট ও ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। সবমিলিয়ে, ব্রিকস নেতাদের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের শুল্কনীতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য প্রবাহ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর টেকসই অগ্রগতির জন্য বড় ধরনের হুমকি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১০% অতিরিক্ত শুল্ক ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতীতে ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে চীন-আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, যার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছিল। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে বিভিন্ন দেশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারে এবং বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়বে।

যেসব দেশ একদিকে আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে যুক্ত এবং অন্যদিকে ব্রিকস-এর সদস্য, তাদের জন্য এই শুল্ক নীতি বড় চাপের কারণ হতে পারে। এতে তাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বলেই মনে হচ্ছে।

অতিরিক্ত শুল্কের ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার, পণ্যের দাম বৃদ্ধির এবং বিশ্বব্যাপী উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক জিডিপি কমে যেতে পারে এবং অনেক দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে।

এছাড়া, অনিশ্চিত বাণিজ্য পরিবেশের কারণে বৈশ্বিক বিনিয়োগ কমে যেতে পারে এবং নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।