বিভাজনের নীতি নিয়ে রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রীর সংঘাত বাড়ছেই

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২৭ জানুয়ারী৷৷ রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান এবং প্রশাসনিক প্রধানের মধ্যেও এবার সরকারী

বৃহস্পতিবার আগরতলায় আসাম রাইফেলস ময়দানে প্রজাতন্ত্র দিবসের   অনুষ্ঠানে  রাজ্যপাল তথাগত রায় এবং মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷ ছবি নিজস্ব৷
বৃহস্পতিবার আগরতলায় আসাম রাইফেলস ময়দানে প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল তথাগত রায় এবং মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷ ছবি নিজস্ব৷

অনুষ্ঠানের মঞ্চেই বাক্যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে৷ একদিকে রাজ্যপালের মতে জাতীয় ধর্ম বলতে এদেশে কিছুই নেই৷ ভাষা, সম্প্রদায়, ধর্ম ও লিঙ্গ কেন্দ্রীক কোন ভেদাভেদও এদেশে নেই৷ শান্তি ও সম্প্রীতিই হচ্ছে এদেশের মৌলিক বৈশিষ্ট্য৷ অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার অভিযোগ করেছেন, ধর্ম-বর্ণ- সম্প্রদায়ের কথা বলে দেশে এখন নতুন করে বিরোধ বাঁধানোর চেষ্টা চলছে৷ রাজ্যপালের সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক বাক্যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন৷ বৃহস্পতিবার রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে উপজাতি কল্যাণ দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত রাজ্যভিত্তিক উপজাতি লোকনৃত্য প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করে একইভাবে মুখ্যমন্ত্রীও রাজ্যপালের বক্তব্যের বিরুদ্ধেই মত প্রকাশ করেন৷ তাতে রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিমন্ডলে রাজ্যপালের সাথে শাসক দল এবং মুখ্যমন্ত্রীর একপ্রকার যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে, এমনটাই ধারণা তথ্যাভিজ্ঞ মহলের৷
ঐদিন আগরতলায় আসাম রাইফেলস মাঠে প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যপাল রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সাফল্যের দিকগুলি তুলে ধরেছেন৷ পাশাপাশি তিনি রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগানো গেলে সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন তরান্বিত হবে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন৷ রাজ্যাপল তথাগত রায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে এই ঐতিহাসিক মুহুর্তে সমস্ত ত্রিপুরাবাসীকে অভিনন্দন জানান৷ তিনি বলেন, এটি আমাদের জাতির কাছে একটি বিশেষ মুহুর্ত৷ এদিন তিনি সেই সমস্ত সামরিক, আধা সামরিক বাহিনী ও পুলিশের সমস্ত সদস্যদের প্রতিও বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান৷ যাঁরা আমাদের দেশের ও জাতির আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সুরক্ষা বজায় রাখার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন৷ রাজ্যপাল বলেন, আমাদের দেশের পরম্পরায় হিংসা ও অসহিষ্ণুতার কোন স্থান নেই৷
রাজ্যের উন্নয়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজ্যে সাক্ষরতার হার এখন ৯৬৮২ শতাংশ যা নাকি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ৷ রাজ্যবাসীর স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করতে ছয়টি রাজ্যস্তরীয় হাসপাতাল, ছয়টি জেলা হাসাপাতল, ১১টি মহকুমা হাসপাতাল, ২১টি কমিউনিটি হেলথ্ সেন্টার, ৯৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ১০৩১ উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে৷ রাজ্যপাল জানান, উত্তর পূর্বাঞ্চলের মধ্যে ত্রিপুরাই হচ্ছে সর্বপ্রথম রাজ্য যেখানে জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন রূপায়ণ করা হয়েছে৷ তাতে ২৫ লক্ষ সুবিধাভোগী উপকৃত হয়৷ রেল পরিষেবা, শিক্ষা ব্যবস্থা, খেলুধূলা নিয়ে রাজ্যপাল সাফল্যের দিকগুলি তুলে ধরেন৷ অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল বলেন, ত্রিপুরার ভবিষ্যৎও উজ্জ্বল৷ রাজ্যকে সমৃদ্ধ করার কাজে হাত হাত মিলিয়ে এগিয়ে যেতে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে৷ যাতে ভাষা, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে আমরা সবাই রাজ্যের উন্নয়নে সমান অংশীদার হতে পারে৷
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে উপজাতি কল্যাণ দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত রাজ্যভিত্তিক উপজাতি লোকনৃত্য প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বলেন, ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের কথা বলে দেশে এখন নতুন করে বিরোধ বাঁধানোর চেষ্টা চলছে৷ ১৯০ বছর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এই পদ্ধতিতেই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে৷ এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে না পারলে প্রজাতন্ত্র দিবসের তাৎপর্য মূল্যহীন হয়ে পড়বে৷ তিনি বলেন, শুধু নাচ গানের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দিবসটি পালন করলে চলবে না৷ এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ণ রাখেন সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে দাঁড়িয়েও ত্রিপুরা যদি গরীব, তপশিলী উপজাতি, তপশিলী জাতি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কল্যাণে, গ্রাম-শহরের ফারাক দূর করতে, ভিক্ষাবৃত্তি, অনাহার থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারে তবে সমগ্র দেশে তা কেন করা যাবে না৷ তাই বর্তমানে দেশের যে পরিস্থিতি তার পরিবর্তন এনে প্রকৃত অর্থে প্রজাতন্ত্রকে মানুষের মধ্যে ফলপ্রসূ করতে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেন৷ মুখ্যমন্ত্রী ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তৃত ব্যাখ্যা করে বলেন, এখন যে অবস্থা চলছে তার সঙ্গে আমাদের দেশের স্বাধীনতা বা প্রজাতন্ত্রের মূল লক্ষ্য সাযুজ্যপূর্ণ নয়৷ তাই প্রকৃত অর্থে প্রজাতান্ত্রিক যে ব্যবস্থা তাকে কার্যকরী করলে গেলে মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলি দূর করতে হবে৷ এই সমস্যা দূর করতে দেশের কেন্দ্রীয় সরকারকেই কার্যকরি ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *