নয়াদিল্লি, ১৯ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্য নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে তুলেছিলেন, সেই লক্ষ্য পূরণের পর দলটি রাজ্যে সুশাসন ও দক্ষ প্রশাসনের প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে দুর্নীতি, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দলের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে আসে। একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতির জন্য দলের নেতৃত্ব ও সংগঠন পরিচালনার ধরনকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃণমূলের শাসনকালে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ও আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে এগুলি নিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির অভিযোগ উঠতে থাকে। একই সঙ্গে দলীয় স্তরে ‘কাটমানি’ নিয়ে অভিযোগও বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই দলীয় কর্মীদের কথিত ‘কাটমানি’ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
‘কাটমানি’ বলতে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়া বা বিভিন্ন পরিষেবা ও নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে অবৈধ কমিশন নেওয়ার অভিযোগকে বোঝানো হয়। সেই সময় বিষয়টি নিয়ে রাজ্যজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় টাকা ফেরতের দাবিও ওঠে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, গবাদি পশু ও কয়লা পাচার থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ পর্যন্ত একাধিক বিষয় তৃণমূলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে দলের একাধিক শীর্ষ নেতার নামও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন অভিযোগের আইনি ও তদন্তগত অবস্থান এক নয় এবং অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখা যায় না।
এর পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের প্রশ্নে বিভাজনও ক্রমশ স্পষ্ট হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত শিবির, অন্যদিকে দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে দলের কিছু প্রবীণ নেতাকে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই প্রবীণ নেতাদের অনেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক ভূমিকা বৃদ্ধির সঙ্গে একটি পেশাদার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থার ভূমিকা নিয়েও দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আই-প্যাকের ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলের কিছু নেতা আপত্তি তুলেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির মতে, দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রকাশ্যে বড় আকার না নিলেও তা পুরোপুরি দূর হয়নি। পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যতে দলের নেতৃত্বের প্রশ্নেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। তবে দলীয় নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন মহলের বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংগঠন এবং সরকারের মধ্যে সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে তাঁর প্রশাসনিক ভূমিকা এবং দল পরিচালনার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ, নেতৃত্বের কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। তবে দলটির উত্থান ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে ভোটের ফল, প্রশাসনিক রেকর্ড, দুর্নীতির অভিযোগ এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি—সবকটি বিষয়কেই আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
—আইএএনএস



















