ঢাকা, ১৯ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): সক্ষমতা ও চরিত্র গঠনের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান সংকট সেই মৌলিক ব্যর্থতারই প্রতিফলন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের শিক্ষা সংকটকে প্রায়ই পরীক্ষায় নকল, দুর্বল শিক্ষার ফলাফল, মুখস্থনির্ভর পাঠ্যক্রম, দুর্বল কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিকরণ এবং দীর্ঘদিনের অর্থাভাবের মতো বিচ্ছিন্ন সমস্যার সমষ্টি হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর একটি সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এগুলি বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার একই অন্তর্নিহিত দুর্বলতার বারবার প্রকাশ।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরও ৫১ শতাংশ শিশু বয়সোপযোগী লেখা পড়ে তার অর্থ বুঝতে সক্ষম হয় না। দেশে প্রায় সব শিশুই স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও এই পরিসংখ্যানকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শিশুদের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার পর্যায় থেকে অনেকটাই এগিয়েছে, কিন্তু তাদের যথাযথভাবে শেখানোর ক্ষেত্রে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পর এখন শিক্ষার গুণমান নিশ্চিত করাই বড় সমস্যা।
বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি ব্যয়ও দীর্ঘদিন ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ শতাংশ বা তার কম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউনেস্কোর ‘এডুকেশন ২০৩০’ কাঠামোতে নির্ধারিত জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয়ের মানদণ্ডের তুলনায় এই বরাদ্দ যথেষ্ট কম বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে, শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। দুর্বল প্রশাসন, শিক্ষাদানের মান এবং ত্রুটিপূর্ণ পাঠ্যক্রমের মতো বিষয়গুলির সংস্কারও জরুরি। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত অর্থ ছাড়া দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার এবং প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশের সামনে শিক্ষাক্ষেত্রে বেশি অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি সেই অর্থ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রতিবেদনের মতে, শিক্ষার এই দুর্বলতাগুলির প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর পড়বে। দেশের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত মানবসম্পদ ও দক্ষতা গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে যে শিশু দুর্বল শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠছে, ২০৫০ সালে কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার প্রভাব দেখা যেতে পারে। একইভাবে আজকের মুখস্থনির্ভর কারিগরি শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতার সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারেন, আর আজকের রাজনীতিকৃত বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যতে দুর্বল গবেষণা পরিকাঠামোর কারণ হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মানবসম্পদ ও দক্ষতার ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব নয়। একটি কারখানা কয়েক বছরের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব কিংবা কয়েক মাসে বিনিয়োগ সংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু মানুষের সক্ষমতা তৈরি করতে একটি প্রজন্মের সময় লাগে। তাই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান সমস্যাগুলির সমাধান দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক সংস্কারের দাবি রাখে।
—আইএএনএস



















