ভাদনগর, ১৭ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭৬তম জন্মদিন এবং জনজীবনে ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে শুরু হওয়া ‘সেবা সংকল্প অভিযান’-এর উদ্দেশ্য শুধু জন্মদিন উদযাপন নয়, বরং শিশু, কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের সামনে তাঁর জনজীবনের যাত্রা তুলে ধরা—বৃহস্পতিবার এমনটাই জানালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ভাদনগরে অভিযানের সূচনা করে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশের সেবার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
শর্মিষ্ঠা লেকের কাছে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অমিত শাহ বলেন, কিছু মানুষ এই ধরনের দেশব্যাপী কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নরেন্দ্র মোদির জীবন এমনভাবে তুলে ধরা উচিত, যাতে দেশের প্রতিটি শিশু, কিশোর ও তরুণ তাঁর জনসেবার যাত্রা সম্পর্কে জানতে পারে এবং ভবিষ্যতে বহু তরুণ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পায়।
তিনি বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার লক্ষ্য পূরণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে বহু তরুণ, কিশোর ও শিশুকে ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ বা ‘দেশ আগে’ নীতিতে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্মস্থান ভাদনগর থেকে তাঁর সংসদীয় কেন্দ্র এবং রাজনৈতিক ‘কর্মভূমি’ বারাণসী পর্যন্ত একটি সেবা যাত্রারও সূচনা করা হয়। অমিত শাহ জানান, এই যাত্রা ভাদনগরের হাটকেশ্বর মহাদেব মন্দির থেকে বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ মন্দির পর্যন্ত যাবে। সাতটি রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামের মধ্য দিয়ে এই যাত্রা প্রধানমন্ত্রীর ২৫ বছরের জনজীবনের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে বলে তিনি জানান।
শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, ভাদনগর ও বারাণসী থেকে প্রায় ৩০০ জন করে মোট ৬০০ জন বাইকার এই যাত্রায় অংশ নেবেন। ভাদনগরকে প্রধানমন্ত্রীর জন্মস্থান এবং বারাণসীকে তাঁর ‘কর্মভূমি’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই যাত্রার মাধ্যমে দুই গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে সংযুক্ত করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে তাঁর পূর্বপুরুষের শহর ভাদনগরে উপস্থিত হতে পেরে নিজের সৌভাগ্যের কথা উল্লেখ করেন অমিত শাহ। তিনি হাটকেশ্বর মহাদেব মন্দিরে প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কামনা করে প্রার্থনা করেন।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনের ২৫ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ তুলে শাহ দাবি করেন, স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক নেতা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোট ২৫ বছর দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি বলেন, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে মোদির এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছিল।
অমিত শাহ দাবি করেন, এই ২৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী জনসেবার প্রতি প্রতিশ্রুতিতে কোনও বিরতি দেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দরিদ্র মানুষ, অনগ্রসর শ্রেণি, দলিত এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি বিজেপি কর্মীদের ‘দেশ আগে’ নীতিতে সংগঠিত করার কথাও উল্লেখ করেন।
মোদির শৈশবের প্রসঙ্গ তুলে শাহ বলেন, ভাদনগরে তাঁর শৈশব দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছিল। তবে সেই পরিস্থিতিকে ক্ষোভের কারণ না করে তিনি এমন একটি উন্নয়ন ভাবনা সামনে এনেছিলেন, যেখানে সমাজের সব অংশের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছবে। শাহের বক্তব্য, উন্নয়নকে সর্বব্যাপী ও সর্বজনীন করার ধারণা প্রধানমন্ত্রী সামনে এনেছেন।
গুজরাটের গ্রামগুলিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, তাঁর সাংগঠনিক কাজের সময় গ্রামবাসীরা নেতাদের দীর্ঘ বক্তৃতার পরিবর্তে খাবারের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলতেন। শাহের দাবি, গুজরাটে নরেন্দ্র মোদির সরকারের সময় ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়।
জাতীয় স্তরে মোদি সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন শাহ। তাঁর বক্তব্যে আবাসন, শৌচাগার, বিদ্যুৎ, নলবাহিত পানীয় জল, খাদ্যশস্য, স্বাস্থ্য বিমা এবং রান্নার গ্যাসের মতো পরিষেবার উল্লেখ আসে। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর আমলে ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে উঠে এসেছেন এবং বিভিন্ন সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন ৮০ কোটি মানুষ।
নারীদের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ সম্প্রসারণের কথাও বলেন শাহ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজ্ঞান, স্টার্টআপ, ড্রোন এবং খেলাধুলায় নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বেড়েছে। সংসদ ও রাজ্য বিধানসভায় নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অমিত শাহ ২০১৪ সালের আগে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, সেই সময় মানুষের মধ্যে হতাশা ছিল এবং দুর্নীতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। তাঁর দাবি, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে এবং ২০২৬ সালে ১৪০ কোটি ভারতীয় ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশা ও সংকল্প নিয়ে এগোচ্ছেন।
শাহ আরও দাবি করেন, মোদি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার সময় ‘নীতিগত অচলাবস্থা’ ছিল, যা পরবর্তীতে স্পষ্ট নীতির মাধ্যমে বদলানো হয়েছে। তিনি পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটি, জন ধন-আধার-মোবাইল ব্যবস্থা এবং সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর বা ডিবিটির মতো উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ব্যাংকিং সংস্কার, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এবং উৎপাদন-সংযুক্ত উৎসাহ প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন পরিবর্তনের দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, বন্দর এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর সম্প্রসারণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিমানবন্দরের সংখ্যা ৭৫ থেকে বেড়ে ১৫০ হয়েছে। পরিকাঠামো প্রকল্পগুলির মধ্যে সমন্বয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়নের জন্য ‘পিএম গতিশক্তি’ উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং স্টার্টআপ ইন্ডিয়ার মতো উদ্যোগ তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে বলেও শাহ দাবি করেন। সীমান্তবর্তী এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সহায়ক হয়েছে বলে তিনি জানান।
জাতীয় নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার প্রসঙ্গে অমিত শাহ সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, তিন তালাক প্রথা বিলোপ, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং নতুন ফৌজদারি আইনের উল্লেখ করেন। নকশালবাদমুক্ত ভারত গড়ার সরকারি লক্ষ্য, উত্তর-পূর্বে বিভিন্ন শান্তিচুক্তি এবং সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, এয়ার স্ট্রাইক ও অপারেশন সিঁদুরের মতো সামরিক অভিযানের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
আদিবাসী কল্যাণের প্রসঙ্গে শাহ একলব্য বিদ্যালয়, পিএম-জনমন এবং ভাইব্র্যান্ট ভিলেজেস কর্মসূচির উল্লেখ করেন। নতুন সংসদ ভবন নির্মাণ এবং সেঙ্গোল স্থাপনের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, এই উদ্যোগগুলিকে জাতীয় চেতনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
মহাকাশ কর্মসূচির প্রসঙ্গে চন্দ্রযান, আদিত্য-এল১ এবং ‘শিব শক্তি পয়েন্ট’-এর নামকরণের কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি ‘ওয়ান র্যাঙ্ক, ওয়ান পেনশন’ এবং চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ পদ তৈরির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন নরেন্দ্র মোদির কাজের প্রসঙ্গেও শাহ একাধিক বিষয় তুলে ধরেন। গ্রামগুলিতে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ, কৃষি উন্নয়ন, বনবন্ধু কল্যাণ যোজনা, সাগরখেদু উন্নয়ন প্রকল্প, শিল্পোন্নয়ন, ভাইব্র্যান্ট গুজরাট এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তিনি উল্লেখ করেন।
শাহ বলেন, গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছনোর প্রভাব শুধু মানুষের দৈনন্দিন সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের সঙ্গে ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পরিকাঠামোরও প্রসার ঘটে। বনবন্ধু ও সাগরখেদু প্রকল্পের মাধ্যমে আদিবাসী সম্প্রদায় এবং উপকূলবর্তী এলাকার গ্রামগুলির উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি জানান।
অমিত শাহের দাবি, গুজরাটে এই উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলিই পরবর্তীকালে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক জনসমর্থনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
—আইএএনএস



















