নয়াদিল্লি, ১৩ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): ভারতের সভাপতিত্বে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সাফল্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী সংবাদপত্র ও প্রকাশনা দিল্লিতে অনুষ্ঠিত দুই দিনের এই সম্মেলন এবং ভারতের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রশংসা করেছে।
শনিবার থেকে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে শুরু হয়েছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। জাপান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিয়ে সদস্য দেশগুলির মধ্যে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শনিবার একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেন এবং ব্রিকস সদস্য দেশগুলিকে একটি ‘কঠোর ভাষায় যৌথ বিবৃতি’র দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দিনের সম্মেলনে ১০টি পূর্ণ সদস্য দেশ এবং সৌদি আরব কোনও নির্দিষ্ট দেশের নাম না করলেও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে এবং এমন পদক্ষেপ এড়ানোর কথা বলেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বেসামরিক পরিকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় ইচ্ছাকৃত হামলা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
রুশ সরকারি সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, ব্রিকস নেতাদের বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মোদি আগামী ২০ বছরের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে ব্রিকসের সিদ্ধান্তগুলির ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত দুই দশকে ব্রিকস আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছে। সদস্য দেশগুলি একে অপরের অবস্থানকে সম্মান করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে চলেছে। কারও বিরুদ্ধে সংঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং সকলকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নের পথ তৈরি করাই ব্রিকসের লক্ষ্য হওয়া উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এখন ব্রিকসের ঐক্য ও ঐকমত্যকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে বলে জানান মোদি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাও ব্রিকসের যৌথ ঘোষণাকে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিকস দেশগুলি মধ্যপ্রাচ্যে সংযমের আহ্বান জানিয়ে এবং বিশ্ব বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল ও জ্বালানির অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরে যৌথ ঘোষণা সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, সদস্য দেশগুলির ওপর শুল্কের চাপ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ব্রিকস দেশগুলির মতপার্থক্যের মতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে নয়াদিল্লি এই জোটের সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছে। যৌথ ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে, ইউরেশিয়া রিভিউ ব্রিকস বিজনেস ফোরামের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। ব্যবসায়ী নেতা, মন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য এই ফোরাম বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং ব্রিকস অর্থনীতিগুলির সামনে থাকা উন্নয়ন সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ নিয়ে মতবিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে।
ব্রিকস বিজনেস কাউন্সিলের সুপারিশ নিয়েও ফোরামে আলোচনা হয়েছে। আন্তঃব্রিকস বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, মান সংক্রান্ত সহযোগিতা এবং মূল্যশৃঙ্খল সংহতির মতো ক্ষেত্রে বিজনেস কাউন্সিলের সুপারিশগুলি ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণাপত্র ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনায় নিয়মিতভাবে প্রতিফলিত হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী সংবাদপত্রও নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলনকে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল হয়ে পড়া জোট, আঞ্চলিক সংঘাত এবং ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনশীল সমীকরণ বোঝার ক্ষেত্রে এই সম্মেলন তাৎপর্যপূর্ণ।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে প্রশ্ন তুলেছে, ব্রিকস সম্মেলনে উন্নয়নশীল বিশ্বের ওপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাকি চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেশি প্রভাবশালী কণ্ঠ হিসেবে উঠে আসবেন। অন্যদিকে, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ভারত ও চিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অনিশ্চয়তা দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর জন্য নতুন কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন ভারতের কূটনৈতিক নেতৃত্ব, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার দিক থেকে আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ নজর কেড়েছে।
—আইএএনএস
























