নয়াদিল্লি, ২১ আগস্ট( আইএএনএস): বিশ্বজুড়ে তেল শোধন ক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও ভারত তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে। দেশের তেল শোধন ক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ২৭২ মিলিয়ন মেট্রিক টন প্রতি বছর থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মেট্রিক টনে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে ভারত। শুক্রবার এই তথ্য জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী।
মন্ত্রী বলেন, ভারত বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল শোধনকারী দেশ। দেশে ২৩টি তেল শোধনাগার রয়েছে, যেগুলিতে বছরে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা হয়। বিশ্বব্যাপী শোধন ক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারত নিজের পরিশোধন ক্ষমতা আরও বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে।
পুরী বলেন, ভারত এখন পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের একটি নিট রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই শোধন ক্ষমতাকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে না দেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ এবং স্থিতিশীল জ্বালানি অংশীদার হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যম হিসেবে দেখছে ভারত। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলির ক্ষেত্রে ভারতের এই ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি।
ভারত ও মরিশাসের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন এবং মরিশাসের স্টেট ট্রেডিং কর্পোরেশন-এর মধ্যে পাঁচ বছরের একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এই চুক্তির আওতায় ভারতীয় তেল মরিশাসে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ করবে। এর মধ্যে রয়েছে পেট্রোল, ডিজেল, মেরিন গ্যাস অয়েল এবং এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী এবং মরিশাসের বাণিজ্য ও ভোক্তা সুরক্ষা মন্ত্রী জন মাইকেল তজুন সাও ইয়ুং সিক ইউয়েনের মধ্যে তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে সহযোগিতা সংক্রান্ত মৌ স্বাক্ষরিত হয়।
পুরী জানান, পাঁচ বছরের সরবরাহ চুক্তির ফলে মরিশাস দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা পাবে। একই সঙ্গে জ্বালানির দামের স্থিতিশীলতা এবং দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তাও আরও শক্তিশালী হবে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানান, ভারত ও মরিশাসের মধ্যে সরকার-সরকার এবং ব্যবসা-ব্যবসা পর্যায়ের এই চুক্তিগুলি দ্বিপাক্ষিক জ্বালানি সহযোগিতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এর ফলে মরিশাস নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ পাবে এবং পরবর্তী তিন বছরের জন্য ভারতীয় তেলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী সংস্থা হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান দেওয়া হবে।
পুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত-মরিশাস জ্বালানি অংশীদারিত্বের মূল ভিত্তি হল পূর্বানুমানযোগ্যতা, স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধির প্রতি দুই দেশের অভিন্ন অঙ্গীকার।
ভারত ও মরিশাসের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতার সম্পর্ক নতুন নয়। ২০০১ সালে ইন্ডিয়ান অয়েল মরিশাসের বাজারে কাজ শুরু করার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে এই ক্ষেত্রে সহযোগিতা চলে আসছে। ইন্ডিয়ান অয়েল মরিশাস লিমিটেডের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ভারতীয় সংস্থাটি।
পুরী বলেন, নতুন চুক্তি দীর্ঘদিনের এই অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে ভারত যে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার, তা আরও স্পষ্ট করবে।
শুধু অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের ক্ষেত্রেই নয়, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানি নিয়েও ভারত-মরিশাস সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পুরী জানান, মরিশাস গ্লোবাল বায়োফুয়েলস অ্যালায়েন্সের (GBA) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। GBA-র সহায়তায় মরিশাস যে নতুন জাতীয় বায়োফুয়েল নীতি কাঠামো তৈরি করেছে, তার ফলে ভবিষ্যতে পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানির ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর হতে পারে।
তিনি বলেন, এই সহযোগিতা শুধু অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বায়োফুয়েলসহ ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ক্ষেত্রেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আরও বলেন, গত কয়েক বছরে ভারত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধন কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। বর্তমানে দেশের ২৩টি রিফাইনারিতে বছরে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেল পরিশোধন করা হয়।
আগামী দিনে এই ক্ষমতা প্রায় ৩০০-তে পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভারতের গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
পুরীর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত শুধু নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকেই এগোচ্ছে না, বরং বিশ্বের অন্যান্য বন্ধুদেশের জন্যও একটি নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল জ্বালানি অংশীদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।
মরিশাসের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তিকে সেই বৃহত্তর জ্বালানি কূটনীতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন সরবরাহ চুক্তির মাধ্যমে মরিশাসের পরিবহণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা আরও জোরদার হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।



















