আগরতলা, ১১ আগস্ট: আগামী ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এর মধ্যে রাজ্যের সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে ত্রিপুরা সরকার। মঙ্গলবার ইন্টিগ্রেটেড হেলথ ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় এই লক্ষ্য ঘোষণা করেন রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব কিরণ গিত্তে, আইএএস।
একই অনুষ্ঠানে পশ্চিম ত্রিপুরা জেলাকে রাজ্যের ‘মডেল জেলা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নাগরিক, স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্র এবং চিকিৎসকদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে এসে স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ এবং রোগীবান্ধব করে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি আয়ুষ্মান ভারত ডিজিটাল মিশন -এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল হেলথ অথরিটির সিইও ড. সুনীল কুমার বার্নওয়াল, আইএএস, ড. পঙ্কজ কুমার অরোরা, ড. শৈলেশ কুমার যাদব, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব তথা ন্যাশনাল হেলথ অথরিটি -এর মিশন ডিরেক্টর সাজু ওয়াহিদ এ., আইএএস এবং ত্রিপুরার এবিডিএম -এর স্টেট মিশন ডিরেক্টর ড. জি. সারত নায়ক, আইএএস-সহ অন্যান্য আধিকারিকরা।
এর আগে সোমবার ড. বার্নওয়াল আগরতলার ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আগরতলা সিভিল হাসপাতাল পরিদর্শন করে হাসপাতালের ডিজিটাল পরিকাঠামো ও কাগজবিহীন পরিষেবা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। ওপিডি ও আইপিডি -তে ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার এবং ‘কম্পিউটার অন হুইলস’ পরিষেবাও তিনি পর্যালোচনা করেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে হাসপাতালের কর্মীরা রোগীর শয্যার পাশে থেকেই ডিজিটালি রোগীর তথ্য নথিভুক্ত ও পরিচালনা করতে পারেন।
হাসপাতালের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে ড. বার্নওয়াল জানান, ভারতে এতটা সমন্বিত ও কাগজবিহীন স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা খুব কমই তিনি দেখেছেন। ত্রিপুরা যদি বৃহৎ পরিসরে এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে রাজ্যটি ভারতের অন্যতম ‘মডেল ডিজিটাল হেলথ স্টেট’ হিসেবে উঠে আসতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি জানান, একটি সম্পূর্ণ সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রত্যেক নাগরিকের আভা আইডি, প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের হেলথ ফেসিলিটি রেজিস্ট্রি -তে নিবন্ধন এবং চিকিৎসকদের হেলথকেয়ার প্রোফেশনাল রেজিস্ট্রি -তে অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। পাশাপাশি সমস্ত স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে আইএইচএমআইসি এবং এবিডিএম -সমর্থিত সফটওয়্যারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
কর্মশালায় ড. বার্নওয়াল এবিডিএম -কে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চালু হওয়া এই মিশনের অধীনে দেশে ইতিমধ্যেই ৯৭ কোটিরও বেশি আভা আইডি তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্যসচিব কিরণ গিত্তে জানান, ত্রিপুরার একাধিক স্বাস্থ্য পরিষদ—যেমন মেডিক্যাল, ফার্মেসি, নার্সিং এবং অ্যালাইড হেলথ কাউন্সিল—ইতিমধ্যেই অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং অনলাইনে শংসাপত্র প্রদানের ব্যবস্থা চালু করেছে।
তিনি বলেন, সময় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলেও লক্ষ্য স্পষ্ট এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো স্বাস্থ্য পরিষেবাকে ডিজিটাল করার বিষয়ে সরকার আত্মবিশ্বাসী। আগামী নভেম্বর মাসে NHA-এর সিইওকে ফের ত্রিপুরায় আমন্ত্রণ জানিয়ে এই ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্য তুলে ধরার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আয়ুষ্মান ভারত-প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা এবং মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা -র অগ্রগতির তথ্যও তুলে ধরা হয়। ৩০ জুন, ২০২৬ পর্যন্ত ত্রিপুরায় পিএম- জেএওয়াই -এর অধীনে ১৬.৬ লক্ষেরও বেশি আয়ুষ্মান কার্ড ইস্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৫.৭ লক্ষেরও বেশি সুবিধাভোগী ক্যাশলেস চিকিৎসা পরিষেবা পেয়েছেন। হাসপাতালগুলির মাধ্যমে ৩০৭ কোটি টাকারও বেশি চিকিৎসা-সংক্রান্ত দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এছাড়াও ত্রিপুরার বাইরে তালিকাভুক্ত হাসপাতালে আরও ৯,২৮৩ জন সুবিধাভোগী ক্যাশলেস চিকিৎসা পেয়েছেন।
অন্যদিকে, সিএম জেএওয়াই-এর অধীনে ৬.৩ লক্ষেরও বেশি কার্ড ইস্যু হয়েছে। এই প্রকল্পে ৯২ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্যাশলেস চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ৫০ কোটি টাকারও বেশি চিকিৎসা-সংক্রান্ত দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে। রাজ্যের বাইরে আরও ২,২১৮ জন সুবিধাভোগী চিকিৎসা পরিষেবা পেয়েছেন।
অনুষ্ঠানে পিএম- জেএওয়াই এবং সিএম জেএওয়াই-এর আওতায় বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করানো চারজন সুবিধাভোগীও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা তাঁদের ক্যাশলেস চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রকল্পগুলির জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
পশ্চিম ত্রিপুরা জেলাকে ‘মডেল জেলা’ হিসেবে ব্যবহার করে রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিষেবা দ্রুত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের অন্যতম ডিজিটালি সক্ষম স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা হিসেবে ত্রিপুরাকে প্রতিষ্ঠিত করার পথ আরও প্রশস্ত হবে বলে মনে করছে রাজ্য সরকার।



















