নয়াদিল্লি, ১১ আগস্ট : পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে তৈরি হওয়া আপিল ট্রাইব্যুনালগুলির মামলার নিষ্পত্তির জন্য আপাতত কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিল না সুপ্রিম কোর্ট। তবে, ট্রাইব্যুনালগুলির কাজ কতটা এগিয়েছে এবং কতগুলি মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে শীর্ষ আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়েছে। আদালত নির্বাচন কমিশনকে এসআইআর-সংক্রান্ত আপিল ট্রাইব্যুনালগুলিতে এখনও পর্যন্ত কতগুলি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কতগুলি মামলা বাকি রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান জমা দিতে বলেছে।
কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর দায়ের করা একটি রিট মামলার শুনানিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়। এসআইআর-এর সময় ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি।
আবেদনকারীর পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে সিনিয়র অ্যাডভোকেট রউফ রহিম বলেন, ট্রাইব্যুনালগুলিতে আপিলের নিষ্পত্তি যে গতিতে হচ্ছে, তা পরিস্থিতির গুরুত্বের তুলনায় যথেষ্ট নয়। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় অনেক মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু ভোটাধিকারেই সীমাবদ্ধ নয়, রেশনসহ বিভিন্ন সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে আদালতে জানানো হয়।
শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানতে চান, এখনও পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালগুলি কতগুলি আপিলের নিষ্পত্তি করেছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট দামা শেষাদ্রি নাইডু আদালতকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানান।
তবে এই পর্যায়ে আপিল নিষ্পত্তির জন্য কোনও বাধ্যতামূলক নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে রাজি হয়নি বেঞ্চ। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালগুলির কাজের ক্ষেত্রে কোনও প্রশাসনিক বা পরিকাঠামোগত সমস্যা থাকলে তা খতিয়ে দেখারও ইঙ্গিত দিয়েছে আদালত।
শুনানিতে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করেন, আপিলের প্রক্রিয়া যদি অত্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থাটির কার্যকারিতাই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এমনকি পরবর্তী নির্বাচন চলে আসার পরও যদি মামলাগুলির নিষ্পত্তি চলতে থাকে, তাহলে তার বাস্তবিক গুরুত্ব অনেকটাই কমে যেতে পারে বলেও পর্যবেক্ষণ করে আদালত।
এসআইআর-এ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে আপিলের শুনানির জন্য প্রাক্তন হাইকোর্টের বিচারপতিদের নেতৃত্বে একাধিক অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনালগুলির কার্যকারিতা নিয়ে এর আগেও আদালতে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছিল, যে হারে মামলাগুলির নিষ্পত্তি হচ্ছে, সেই গতি বজায় থাকলে বর্তমান বিপুল ব্যাকলগ কাটাতে প্রায় ২১ বছর সময় লেগে যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৪ লক্ষ বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের কাছে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে বাস্তব পরিসংখ্যান চাওয়ার বিষয়টি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালগুলির বর্তমান পরিকাঠামো, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং মামলার নিষ্পত্তির গতি বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে যাচাই করতে চাইছে শীর্ষ আদালত।
এদিন অধীর রঞ্জন চৌধুরীর মামলাটি এসআইআর অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালগুলির কার্যকারিতা সংক্রান্ত আরও একটি মামলার সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে বেঞ্চ। সংযুক্ত মামলাগুলির পরবর্তী শুনানি হবে ২৫ আগস্ট।
সেদিন নির্বাচন কমিশন ট্রাইব্যুনালগুলির নিষ্পত্তি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য আদালতে পেশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই তথ্য পর্যালোচনার পরই প্রয়োজন হলে আরও নির্দেশ দেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া এবং বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা নিয়ে যখন একাধিক মামলা আদালতে চলছে, তখন সুপ্রিম কোর্টের এই পদক্ষেপে বিষয়টির বিচারবিভাগীয় নজরদারি আরও জোরদার হল।



















