নয়াদিল্লি, ৬ আগস্ট (আইএএনএস): তফসিলি জাতি (এসসি) ও তফসিলি উপজাতি (এসটি)-র সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ‘ক্রিমি লেয়ার’ নীতি চালুর দাবির বিরোধিতা করল কেন্দ্রীয় সরকার। সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হলফনামায় কেন্দ্র স্পষ্ট জানিয়েছে, এ ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত আদালতের নির্দেশে কার্যকর করা যায় না। এমন কোনও পদক্ষেপের আগে বিস্তৃত তথ্যভিত্তিক সমীক্ষা ও সামগ্রিক পর্যালোচনা জরুরি।
কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রক আদালতে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট জনস্বার্থ মামলায় (পিআইএল) আবেদনকারীরা আদালতের মাধ্যমে সরকারকে নির্দিষ্ট ধরনের সংরক্ষণ নীতি প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন। কিন্তু নীতিনির্ধারণ সম্পূর্ণভাবে নির্বাহী বিভাগের বিষয় এবং তা বিচার বিভাগের আওতার বাইরে।
হলফনামায় বলা হয়েছে, এসসি, এসটি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি)-কে চিহ্নিত করার ভিত্তি শুধুমাত্র আর্থিক অবস্থা নয়। বরং ঐতিহাসিক বৈষম্য, সামাজিক বঞ্চনা, জাতিগত পরিচয় এবং শিক্ষাগত অনগ্রসরতার মতো বিষয়গুলিই সংরক্ষণের মূল ভিত্তি।
কেন্দ্রের বক্তব্য, সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হল দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার সম্প্রদায়গুলিকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, সমান সুযোগ তৈরি করা এবং শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না, তাই শুধুমাত্র আয়ের ভিত্তিতে সংরক্ষণের সুবিধা সীমিত করার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকার আরও জানিয়েছে, এসসি, এসটি ও ওবিসিদের জন্য চালু থাকা বহু কল্যাণমূলক প্রকল্পে ইতিমধ্যেই আয় বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ এবং সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তার সাংবিধানিক ভিত্তিও আলাদা।
হলফনামায় সুপ্রিম কোর্টের একাধিক পূর্ববর্তী রায়ের উল্লেখ করে কেন্দ্র জানায়, ১৯৯২ সালের ঐতিহাসিক ইন্দ্রা সহানি মামলায় সাংবিধানিক বেঞ্চ স্পষ্টভাবে বলেছিল, ‘ক্রিমি লেয়ার’ নীতি শুধুমাত্র ওবিসি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এসসি ও এসটি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এই নীতির প্রাসঙ্গিকতা নেই। পরবর্তী বিভিন্ন রায়েও একই অবস্থান বহাল রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রের মতে, ভবিষ্যতে যদি সংরক্ষিত শ্রেণির মধ্যে আয়ের ভিত্তিতে কোনও নতুন ব্যবস্থা চালুর কথা বিবেচনা করা হয়, তাহলে তার আগে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করা আবশ্যক।
নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালতের সীমিত ভূমিকার কথাও হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, কোনও সরকারি নীতি সংবিধান বা আইনের পরিপন্থী না হলে আদালত সরকারকে নির্দিষ্ট ধরনের নীতি গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারে না। কোনও নীতি আরও ভালো হতে পারত কি না, সেই প্রশ্নে বিচার বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
এই মামলাকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উল্লেখ করে কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টকে আবেদন খারিজ করার আর্জি জানিয়েছে। সরকারের দাবি, আবেদনকারীরা কোনও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় প্রমাণ করতে পারেননি এবং সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে রিট জারির মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি।
উল্লেখ্য, এর আগে সুপ্রিম কোর্ট এসসি ও এসটি সংরক্ষণে ‘ক্রিমি লেয়ার’ নীতি প্রয়োগের দাবিতে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলায় কেন্দ্র ও সমস্ত রাজ্য সরকারকে নোটিস পাঠিয়ে তাদের মতামত চেয়েছিল। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, এসসি ও এসটি সম্প্রদায়ের তুলনামূলকভাবে আর্থ-সামাজিকভাবে উন্নত পরিবারগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম সংরক্ষণের সুবিধা ভোগ করছে। ফলে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষেরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই দাবির পক্ষে আবেদনকারীরা ২০২৪ সালের ১ আগস্ট ঘোষিত পাঞ্জাব রাজ্য বনাম দবিন্দর সিং মামলার সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়ের উল্লেখ করেন। ওই রায়ে তফসিলি জাতির মধ্যে উপ-শ্রেণিবিভাগের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা ‘ক্রিমি লেয়ার’ নীতি প্রয়োগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
তবে ওই রায়ের পরই কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছিল, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী এসসি ও এসটি সংরক্ষণে ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর কোনও বিধান নেই এবং সরকারের অবস্থান সেই ক্ষেত্রেও অপরিবর্তিত রয়েছে।



















