নয়াদিল্লি, ৫ আগস্ট(আইএএনএস): বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার দাবি করেছেন, গত দুই বছরে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে এবং বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও দেশের মানুষ এখনও ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন।
নয়াদিল্লি থেকে অডিও লিঙ্কের মাধ্যমে এক সাংবাদিক বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গত দুই বছর ধরে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটালেও তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ এখনও ভয়, সন্ত্রাস, হতাশা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং গভীর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। বক্তব্যের একাধিক সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। গত দুই বছরের ঘটনাবলি স্মরণ করে তিনি বলেন, তিনি তাঁর প্রিয় বাংলাদেশকে কষ্ট পেতে দেখেছেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, আন্দোলনটি শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ সংস্কার আন্দোলন ছিল না। তাঁর দাবি, সংগঠিত কিছু গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এবং তা সহিংসতায় রূপান্তরিত করে।
তিনি বলেন, এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যা আমরা গড়ে তুলেছিলাম। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যার জন্য ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আমার সরকার সংলাপ, আইনি প্রক্রিয়া এবং ধৈর্যের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সংস্কারের দাবির আড়ালে সংগঠিত গোষ্ঠীগুলি শিক্ষার্থীদের দাবিকে সহিংস রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছিল।
শেখ হাসিনার দাবি, তাঁর সরকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল। তিনি নিজে গণভবনে শিক্ষার্থীদের আমন্ত্রণ জানান এবং তিনজন মন্ত্রীও তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে কোটা সংস্কারের দাবিকে পরিকল্পিতভাবে তাঁর পদত্যাগের একদফা আন্দোলনে পরিণত করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচার চালানো হয়। প্রকৃত শিক্ষার্থীদের আবেগকে ব্যবহার করা হয় এবং সংগঠিত গোষ্ঠীগুলি তাঁদের আন্দোলনকে সহিংসতা ও সরকার পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য উদ্ধৃত করে শেখ হাসিনা দাবি করেন, ইউনূস নিজেই জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনকে অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে পরিকল্পিত এবং একজন মাস্টারমাইন্ডের নেতৃত্বে পরিচালিত বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর মতে, এই বক্তব্যই আন্দোলনের সংগঠিত চরিত্রকে স্পষ্ট করে।
তিনি অভিযোগ করেন, এটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না। এর কোনও দৃশ্যমান বা দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ছিল না। অদৃশ্যভাবে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল। ১৫ জুলাইয়ের পর আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। খুন, অগ্নিসংযোগ, হামলা, লুটপাট এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা শুরু হয়।
গত দুই বছরে দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, এই সময়ে অন্তত ১০ হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, সাড়ে ৬ লাখ মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং সাড়ে ৩ হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রায় সাড়ে ৪ লাখ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থককে বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে এবং ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধেই ৬০০-র বেশি মামলা দায়ের হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শেখ হাসিনার অভিযোগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলির নারী কর্মীদের হেনস্তা, নির্যাতন ও হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। অনেক নেতা-কর্মীর কারাগারেই মৃত্যু হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, নির্যাতন, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা, খাদ্য না দেওয়া এবং মৌলিক অধিকার অস্বীকার করার বহু অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগের বাইরেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিচারক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, পেশাজীবী, শ্রমিক, রিকশাচালক, কৃষক এবং সাধারণ নাগরিকদেরও হামলা, গ্রেপ্তার ও হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কেউই এখন নিরাপদ নন বলেও দাবি করেন শেখ হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করা হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের “জুতার মালা” পরিয়ে অপমান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলার চেষ্টা। মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই দেশের অতীত ইতিহাস মুছে দিতে ‘রিসেট বাটন’ চাপার কথা বলেছেন। তারা মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে চায়, বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চায় এবং বাংলাদেশের জন্মের ভিত্তিকেই বদলে দিতে চায়।
বাংলাদেশকে আবার উন্নয়নের পথে ফিরিয়ে আনতেই তিনি দেশে ফিরতে চান বলে জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আমার দেশে ফেরার তারিখ পরে ঘোষণা করা হবে। তবে আমি অবশ্যই আমার মানুষের কাছে ফিরে যাব।” এছাড়া তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তাঁর ও দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া “মিথ্যা মামলা” প্রত্যাহার এবং বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
বক্তব্যের শেষে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মানুষ নিরাপত্তা, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তির অধিকারী। তাঁর ভাষায়, আমার প্রত্যাবর্তন বা আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফেরা ক্ষমতার জন্য নয়। এটি বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য। উন্নয়ন, অগ্রগতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতার পথে দেশকে ফিরিয়ে আনতেই আমি বাংলাদেশে ফিরতে চাই। মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের জীবন আরও ভালো করার লক্ষ্যেই আমার প্রত্যাবর্তন। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমি তাঁদের বিশ্বাস করি, ভালোবাসি এবং তাঁদের কাছেই ফিরে যাব।



















