নয়াদিল্লি/শ্রীনগর/কুলগাম/সাম্বা, ৫ আগস্ট (আইএএনএস): জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা প্রদানকারী আর্টিকেল ৩৭০ কার্যত বাতিলের সাত বছর পূর্ণ হল বুধবার। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কেন্দ্র সরকার আর্টিকেল ৩৭০-কে অকার্যকর করে তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল—জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখে বিভক্ত করে। সপ্তম বর্ষপূর্তিতে একদিকে কেন্দ্রের দাবি, এই সিদ্ধান্তের ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে, উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অন্যদিকে দিনটিকে ঘিরে সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কাশ্মীরজুড়ে জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে অমরনাথ যাত্রা আংশিকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, অনুচ্ছেদ ৩৭০ প্রত্যাহারের আগে জম্মু ও কাশ্মীরে পৃথক সাংবিধানিক বিধান এবং রণবীর দণ্ডবিধি কার্যকর ছিল। সিদ্ধান্তের পর দেশের অন্যান্য অংশের মতো একই আইন সম্পূর্ণভাবে প্রযোজ্য হয়েছে। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার ফলে আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্ব সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে আসে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করেছে বলে সরকারি মহলের বক্তব্য।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ মিলেছে। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) একাধিক তদন্তে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলির অর্থের উৎস খুঁজে বের করে। তদন্তে পাকিস্তান থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ আসার অভিযোগ সামনে আসে। সরকারি সূত্রের দাবি, সেই অর্থের একাংশ সন্ত্রাস ও অশান্তি ছড়াতে ব্যবহার হলেও বড় অংশ ব্যক্তিগত বিলাসিতার জন্য ব্যয় করা হত। এসব তদন্ত প্রকাশ্যে আসার পর বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির প্রতি জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রের আরও বক্তব্য, বিচ্ছিন্নতাবাদ দুর্বল হওয়ায় সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির কার্যকলাপেও প্রভাব পড়েছে। যদিও ২০১৯ সালের পরও জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে, তবে সামগ্রিকভাবে হামলার সংখ্যা কমেছে বলে দাবি। সাম্প্রতিক সময়ে পাহেলগাঁও হামলাকে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর মতে, লস্কর-ই-তইবা এবং তার সহযোগী সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ) এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর থেকে অনুপ্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং সেটাই নিরাপত্তা বাহিনীর অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।
প্রশাসনের দাবি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং স্থানীয় পুলিশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সহজ হয়েছে। এর ফলে জঙ্গি নেটওয়ার্ক এবং ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার (ওডব্লিউজি) চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান আরও কার্যকর হয়েছে।
সরকারের মতে, নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। আর্টিকেল ৩৫এ বাতিল হওয়ায় মহিলাদের সম্পত্তি ও আবাসিক অধিকারের ক্ষেত্রে আগের বিধিনিষেধ উঠে গেছে। নারীর সুরক্ষা, গার্হস্থ্য হিংসা ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় আইন সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থায় সংরক্ষণের মাধ্যমে মহিলাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণও বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে প্রশাসন জানিয়েছে, জাতীয় শিক্ষানীতি (এনইপি) কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি স্কুল-কলেজে নিয়মিত পঠনপাঠন সম্ভব হয়েছে। সন্ত্রাস ও অশান্তির কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার প্রবণতা অনেকটাই কমেছে। একইসঙ্গে উন্নত নিরাপত্তা পরিস্থিতির জেরে পর্যটনের প্রসার ঘটেছে, যার ফলে কর্মসংস্থান, হস্তশিল্প, উদ্যানপালন, পরিষেবা ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় শাসনের পর ২০২৪ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই পরিবর্তনের সাফল্য নির্ভর করবে সন্ত্রাসবাদ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার উপর বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে আর্টিকেল ৩৭০ প্রত্যাহারের বর্ষপূর্তিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বুধবার অমরনাথ যাত্রা আংশিকভাবে স্থগিত রাখা হয়। প্রশাসন জানিয়েছে, জম্মু থেকে কাশ্মীরগামী এবং দর্শন শেষে ফেরত আসা তীর্থযাত্রীদের কনভয় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলেও উত্তর কাশ্মীরের বালতাল বেস ক্যাম্প থেকে পবিত্র গুহামন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা অব্যাহত ছিল।
একই দিনে বিরোধী পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি) জেলা স্তরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দেয়। তাদের দাবি ছিল আর্টিকেল ৩৭০ ও ৩৫এ পুনর্বহাল এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি। তবে আইন-শৃঙ্খলার কারণ দেখিয়ে প্রশাসন বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি। শ্রীনগরে পিডিপি কার্যালয় ও সংবেদনশীল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সিআরপিএফ মোতায়েন করা হয়। সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, দলের সভানেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি-সহ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে ঘরবন্দি রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে কুলগামের একাধিক বাসিন্দা আইএএনএস-কে জানান, আর্টিকেল ৩৭০ প্রত্যাহারের পর শান্তি, উন্নয়ন, পর্যটন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে। তাঁদের দাবি, আগে ঘনঘন অশান্তির কারণে স্কুল-কলেজ, বাজার এবং সরকারি দফতর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকত। বর্তমানে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। অনেকেই নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং নারীদের চলাচলে স্বাচ্ছন্দ্যের কথাও উল্লেখ করেন।
সাম্বার পশ্চিম পাকিস্তানি শরণার্থী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও দিনটিকে ‘স্বাধীনতার উৎসব’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, আর্টিকেল ৩৭০ ও ৩৫এ প্রত্যাহারের পর বহু দশকের বঞ্চনার অবসান ঘটেছে এবং নাগরিক অধিকার ও সমান সুযোগ পাওয়ার পথ খুলেছে। সম্প্রদায়ের নেতাদের দাবি, প্রতি বছর ৫ আগস্ট তারা উৎসবের আবহেই পালন করেন এবং ভবিষ্যতেও এই রীতি বজায় থাকবে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও অব্যাহত। একদিকে কেন্দ্র সরকার এবং তাদের সমর্থকরা আর্টিকেল ৩৭০ প্রত্যাহারকে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলি বিশেষ মর্যাদা পুনর্বহাল এবং পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে সাত বছর পরও অনুচ্ছেদ ৩৭০ ইস্যু জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতি এবং জাতীয় আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে।



















