নয়াদিল্লি, ২৬ জুলাই (আইএএনএস): কার্গিল বিজয় দিবসে ১৯৯৯ সালের যুদ্ধে আত্মবলিদানকারী বীর সেনানীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, ভারতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও অস্ত্রের প্রতি বিশ্বের বাড়তে থাকা আস্থার কথা তুলে ধরা, আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রশংসা, মহাকাশ ও বিজ্ঞান ক্ষেত্রে দেশের যুবসমাজের সাফল্যের কুর্নিশ এবং প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় বিহারের সীতামঢ়ির অভিনব উদ্যোগের প্রশংসা— এই সব বিষয়ই উঠে এল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মাসিক রেডিও অনুষ্ঠান ‘মন কি বাত’-এর ১৩৬তম পর্বে।
কার্গিল বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জীবনে এমন কিছু দিন রয়েছে, যার জন্য ক্যালেন্ডার দেখার প্রয়োজন হয় না। ২৬ জুলাই তেমনই একটি দিন। এই দিন আমাদের গর্বে ভরিয়ে দেয় এবং ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর অসাধারণ সাহসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।”
তিনি বলেন, “কার্গিলের সুউচ্চ পর্বত, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং শত্রুর কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আমাদের জওয়ানরা অদম্য সাহস ও মনোবলের পরিচয় দিয়েছিলেন। মাতৃভূমির সুরক্ষায় তাঁরা সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন। আজ কার্গিল বিজয় দিবসে আমি সকল বীর শহিদ ও সেনানীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের ভারত শুধু বীর সেনানীদের স্মরণই করে না, তাঁদের বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে। সেই উদ্দেশ্যেই এ বছর ‘শৌর্য বিজয় যাত্রা’-র আয়োজন করা হয়েছে। ১৪ জুলাই দিল্লির ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়াল থেকে শুরু হওয়া এই মোটরসাইকেল অভিযান দ্রাসের কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়ালে পৌঁছবে। এর মূল বার্তা ‘ওয়ান রাইড, ওয়ান নেশন, ওয়ান স্যালুট’।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতির প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রতিরক্ষা উৎপাদন, রপ্তানি এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলির সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা— সব ক্ষেত্রেই ভারত নতুন উচ্চতায় পৌঁছচ্ছে।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, চলতি মাসে তাঁর ইন্দোনেশিয়া সফরের সময় ব্রহ্মোস এবং অ্যাস্ট্রা ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাঁর কথায়, “ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির উপর বিশ্বের আস্থা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
উল্লেখ্য, এই চুক্তির আওতায় ইন্দোনেশিয়াকে ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে ভারত। পাশাপাশি, ডিআরডিও-র তৈরি দেশীয় প্রযুক্তির অ্যাস্ট্রা ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রও রপ্তানি করা হবে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সেনাদের সাহসিকতার পাশাপাশি ভারত প্রতিনিয়ত নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও শক্তিশালী করছে। তিনি ভারতীয় নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ আইএনএস মহেন্দ্রগিরি-র উল্লেখ করে বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে ভারতে নকশা ও নির্মিত এবং এতে ৭৫ শতাংশেরও বেশি দেশীয় উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। এটি আত্মনির্ভর ভারতের প্রতীক।
তিনি আরও বলেন, ডিআরডিও-র তৈরি পিনাকা লং রেঞ্জ গাইডেড রকেট (এলআরজিআর-১২০) এবং ‘খুশা’ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সাফল্যের নেপথ্যে বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের নিরলস পরিশ্রম রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
‘মন কি বাত’-এ দেশের যুবসমাজের সাফল্যের কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “গত রবিবার বিক্রম-১ রকেটের সফল উৎক্ষেপণ প্রতিটি ভারতীয়কে গর্বিত করেছে। এটি উন্নত ভারতের বেসরকারি খাতের তৈরি প্রথম রকেট। একসময় যা অকল্পনীয় ছিল, আমাদের তরুণ উদ্ভাবকেরা তা সম্ভব করে দেখিয়েছেন।”
তিনি জানান, মহাকাশ ক্ষেত্রকে বেসরকারি সংস্থার জন্য উন্মুক্ত করার ফলে দেশের অসংখ্য তরুণ প্রতিভা নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছে এবং আজ বিশ্বের নজর সেই সাফল্যের দিকেই।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের অসাধারণ সাফল্যেরও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পদার্থবিদ্যা অলিম্পিয়াডে ভারতের পাঁচজন প্রতিযোগীই স্বর্ণপদক জিতে দেশকে প্রথম স্থান এনে দিয়েছে। রসায়ন অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণকারী সকলেই স্বর্ণপদক জিতেছে, যা ভারতের ইতিহাসে সেরা সাফল্য। জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ভারত একটি স্বর্ণ-সহ একাধিক পদক অর্জন করেছে এবং গণিত অলিম্পিয়াডে ভারতীয় পড়ুয়ারা দুটি স্বর্ণ ও চারটি রৌপ্যপদক জিতেছে।
মোদী বলেন, “দেশের যুবশক্তিকে নিয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত। আগামী দিনে আরও বেশি সংখ্যক তরুণ অলিম্পিয়াড, হ্যাকাথন এবং গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারতের নাম উজ্জ্বল করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
পরিবেশ সংরক্ষণের প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিহারের সীতামঢ়ি জেলার ‘ওয়েস্ট টু ওয়েলথ’ উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে সেখানে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বেঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রতিটি বেঞ্চ তৈরিতে প্রায় ৪০ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলি সরকারি স্কুল, পার্ক ও বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে বসানো হচ্ছে। এর ফলে শুধু প্লাস্টিক দূষণ কমছে না, ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীতামঢ়ি প্রমাণ করেছে যে ‘রিডিউস, রিইউজ এবং রিসাইকেল’ এখন আর শুধু স্লোগান নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় শিল্প সংস্থার যৌথ উদ্যোগে প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই, পরিষ্কার ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভাষণের শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “কার্গিল বিজয় দিবসে আসুন, আমরা আমাদের বীর শহিদদের আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই এবং একটি নিরাপদ, সক্ষম ও আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলার সংকল্প আরও দৃঢ় করি।”



















