আগরতলা/গুয়াহাটি, ১ জুলাই (আইএএনএস): বঙ্গোপসাগরে বৃষ্টিবাহী আবহাওয়া ব্যবস্থা দুর্বল থাকা, সক্রিয় মৌসুমি অক্ষরেখার অনুপস্থিতি এবং এল নিনোর প্রভাবে জুন মাসে উত্তর-পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্যের মধ্যে সিকিম বাদে বাকি সাতটি রাজ্যেই মৌসুমি বৃষ্টিতে বড় ঘাটতি দেখা গেছে। যদিও এই সময়ে অসম ও অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তবুও সামগ্রিকভাবে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জুন মাসে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ৪০ শতাংশেরও বেশি বলে বুধবার জানিয়েছে ভারতের আবহাওয়া দফতর (আইএমডি)।
আইএমডি-র তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমির প্রথম মাস জুনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় ৪০ শতাংশেরও বেশি কম বৃষ্টি হয়েছে। আটটি রাজ্যের মধ্যে একমাত্র সিকিমেই স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বেশি বৃষ্টি হয়েছে। সেখানে জুনে ৪৩৮.২ মিমি স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের বিপরীতে ৫১৫.৯ মিমি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
আইএমডি-র এক আধিকারিক জানান, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে গড় বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের (এলপিএ) ৯৪ শতাংশেরও কম থাকতে পারে। ১৯৭১-২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে দেশের দীর্ঘমেয়াদি গড় বৃষ্টিপাত ২৮০.৪ মিমি। দেশের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের নিচে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও উত্তর-পূর্বের কিছু অংশ, উত্তর-পশ্চিম ভারত, পূর্ব-মধ্য ভারত এবং পূর্ব উপদ্বীপীয় অঞ্চলে স্বাভাবিক থেকে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি বিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদদের মতে, খরিফ চাষের জন্য জুলাই মাসের বৃষ্টিপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়েই দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের মতো উত্তর-পূর্বেও বপনের কাজ জোরদার হয়।
আইএমডি-র তথ্য অনুযায়ী, জুনে মেঘালয়ে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ৭৪ শতাংশ এবং মণিপুরে ৭১ শতাংশ, যা ‘লার্জ ডেফিসিয়েন্ট’ শ্রেণিতে পড়ে।
মণিপুর কৃষি দফতরের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, নজিরবিহীন বৃষ্টির ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের জাতিগত সংঘাতের কারণে রাজ্যের কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে খরিফ মরসুমে ইম্ফল উপত্যকা ও পাহাড়ি জেলাগুলিতে কৃষিকাজ নির্বিঘ্ন রাখতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে নাগাল্যান্ডে ৫৬ শতাংশ, অরুণাচল প্রদেশে ৪৪ শতাংশ, অসমে ৩৭ শতাংশ, মিজোরামে ৩৭ শতাংশ এবং ত্রিপুরায় ৩৬ শতাংশ বৃষ্টির ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে।
আইএমডি-র আগরতলা আবহাওয়া কেন্দ্রের অধিকর্তা পার্থ রায় বলেন, এল নিনো এবং অন্যান্য আবহাওয়াগত কারণের সম্মিলিত প্রভাবে জুন মাসে সারা দেশের মতো উত্তর-পূর্বেও বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাঁর মতে, এল নিনোর প্রভাব আগামী মাসগুলিতে আরও বাড়তে পারে।
তিনি জানান, জুনে ত্রিপুরায় ২৫০.৩ মিমি বৃষ্টি হয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৪১ শতাংশ কম। জুলাই মাসে রাজ্যে স্বাভাবিকের নিচে থেকে প্রায় স্বাভাবিক বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।
এবার দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু উত্তর-পূর্ব ভারতে স্বাভাবিক সময়ের দুই দিন পরে, ৭ জুন প্রবেশ করে এবং ১০ জুনের মধ্যে গোটা অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যার ফলে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও শুষ্ক আবহাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সত্ত্বেও আবহাওয়াবিদরা আশাবাদী যে মৌসুমির বাকি সময়ে, বিশেষ করে শীর্ষ পর্যায়ে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হবে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত খরিফ চাষে সহায়তার পাশাপাশি নদী, জলাধার ও ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডার পুনরায় পূরণ করবে এবং সামগ্রিক জলনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।



















