নয়াদিল্লি, ২৩ জুন (আইএএনএস): পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা এবং হরমুজ প্রণালীতে সম্ভাব্য বাধার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের মতো দেশের জন্য বিকল্প বাণিজ্যপথের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ইন্ডিয়া ন্যারেটিভ’-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে গড়ে ওঠা পূর্ব সামুদ্রিক করিডর (ইএমসি) বা ভ্লাদিভস্তক-চেন্নাই সমুদ্রপথ অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত— উভয় দিক থেকেই ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই করিডর ভারতের চেন্নাই বন্দরকে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের ভ্লাদিভস্তক বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ২০২৪ সালে হামাস-ইজরায়েল সংঘাত এবং লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার সময় ভারত এই রুট সক্রিয় করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ইরান-ইজরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে ভারতের জন্য ইএমসি কতটা কার্যকর বিকল্প বাণিজ্যপথ হতে পারে।
ভারতের ইস্পাত ও জ্বালানি খাত ক্রমশ রাশিয়ার কোকিং কয়লা ও অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। সেই কারণে রাশিয়া থেকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইএমসি-কে একটি স্থিতিশীল, কার্যকর এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল সমুদ্রপথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, সুয়েজ খাল হয়ে পণ্য পরিবহণে যেখানে ৪০ দিনেরও বেশি সময় লাগে, সেখানে ইএমসি ব্যবহার করলে যাত্রার সময় প্রায় ২৪ দিন কমে যায়। পাশাপাশি রাশিয়ার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়।
ভারতের ‘সাগরমালা’ প্রকল্পের আওতায় বন্দর পরিকাঠামোর দ্রুত উন্নয়নের কারণেও এই করিডরের গুরুত্ব বেড়েছে। ইএমসি রাশিয়া থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করবে এবং সাগরমালা প্রকল্প সেই পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরও দক্ষ ও কম খরচে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতীয় নৌবাহিনীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা মহড়া ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।
এছাড়া এই প্রকল্প ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বৃহত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংযোগ বাড়িয়ে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ব সামুদ্রিক করিডর ভারতের জন্য আর্কটিক অঞ্চলে প্রবেশের নতুন সুযোগও তৈরি করছে। প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষত বিরল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ আর্কটিক অঞ্চল বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর চীনের মালবাহী জাহাজ ‘ইস্তানবুল ব্রিজ’ আর্কটিক মহাসাগরীয় পথ ব্যবহার করে মাত্র ২০ দিনে ব্রিটেনের ফেলিক্সস্টো বন্দরে পৌঁছে আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারত-রাশিয়া পূর্ব সামুদ্রিক করিডর শুধু একটি বাণিজ্যপথ নয়, বরং ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।



















