ডুন্ডিগল (তেলঙ্গানা), ১৩ জুন (আইএএনএস): তেলঙ্গানার ডুন্ডিগলে অবস্থিত বিমানবাহিনী একাডেমিতে (এএফএ) শনিবার অনুষ্ঠিত ২১৭তম কোর্সের কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েশন প্যারেডে অংশ নিয়ে ২৩১ জন ফ্লাইট ক্যাডেটকে ভারতীয় বায়ুসেনার (আইএএফ) অফিসার হিসেবে কমিশন প্রদান করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন ১৯৪ জন পুরুষ ও ৩৭ জন মহিলা ক্যাডেট। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, প্রথমবারের মতো জাতীয় প্রতিরক্ষা একাডেমি (এনডিএ)-র মহিলা ক্যাডেটদের প্রথম ব্যাচও এদিন কমিশনপ্রাপ্ত হন।
কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং সফলভাবে প্রি-কমিশন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা ক্যাডেটদের রাষ্ট্রপতির কমিশন প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে ভারতীয় নৌবাহিনীর নয়জন, ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীর তিনজন এবং ভিয়েতনামের দুইজন অফিসারকে ‘উইংস’ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ন্যাভিগেশন প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করায় তিনজন অফিসারকে ‘ব্রেভেট’ দেওয়া হয়।
নবনিযুক্ত অফিসারদের অভিনন্দন জানিয়ে রাজনাথ সিংহ বলেন, তাঁরা এমন একটি বাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন, যা সবসময় দেশের ঢাল ও তরবারি হিসেবে কাজ করেছে।
তিনি বলেন, “১৯৪৭-৪৮ সালের কাশ্মীর যুদ্ধে শ্রীনগর এয়ারলিফটের মাধ্যমে ভারতীয় বায়ুসেনা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে মাত্র ১৩ দিনের মধ্যেই নির্ণায়ক বিমান হামলার মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। ২০২৫ সালের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এও সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি নিখুঁতভাবে ধ্বংস করে বায়ুসেনা তাদের অসীম সাহস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।”
প্রতিরক্ষামন্ত্রী নবীন অফিসারদের পরিবর্তিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, আধুনিক যুদ্ধে শত্রু কিংবা অস্ত্র সবসময় দৃশ্যমান হয় না। রাডার, স্যাটেলাইট, ড্রোন, সেন্সর এবং রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহারে যুদ্ধের চরিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে।
তিনি বলেন, “এমন পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে, যেখানে প্রতিপক্ষের ট্রাফিক ব্যবস্থা কিংবা সিসিটিভি নেটওয়ার্ক হ্যাক করে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হচ্ছে। আপনাদের প্রশিক্ষণ এই ধরনের অনিশ্চিত পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করেছে। সর্বদা সজাগ থাকতে হবে।”
রাজনাথ সিংহ ভবিষ্যতের যুদ্ধকৌশল ও প্রযুক্তি সম্পর্কে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, প্রতিটি সংঘাতই নতুন শিক্ষা দেয় এবং শুধু কঠোর পরিশ্রম নয়, বুদ্ধিদীপ্ত কর্মপদ্ধতি ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, “একসময় মনে করা হত বড় শক্তিধর দেশগুলিই সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করে। কিন্তু আজ তুলনামূলকভাবে ছোট শক্তিগুলিও অত্যাধুনিক ও ক্ষুদ্র কিন্তু প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে বড় ক্ষতি করতে সক্ষম হচ্ছে।”
নবীন অফিসারদের উদ্দেশে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, তাঁদের ডানার প্রতীক কেবল একটি পদমর্যাদার চিহ্ন নয়, বরং তা বিশাল দায়িত্বের প্রতীক। অনেক ক্ষেত্রে সেকেন্ডেরও কম সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মহিলা অফিসারদের বিশেষভাবে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, বায়ুসেনায় নারীশক্তির ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ বাহিনীকে আরও শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর করে তুলবে।
ভিয়েতনামি অফিসারদেরও শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতে তাঁদের প্রশিক্ষণ দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করবে।
ভারত ও বিদেশে বিভিন্ন উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা অভিযানে বায়ুসেনার ভূমিকার প্রশংসা করে রাজনাথ সিংহ বলেন, এসব উদ্যোগ ভারতের মানবতাবাদী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “অনেকে বলেন, আকাশই সীমা। ভারতীয় বায়ুসেনার ক্ষেত্রে এটি সত্য হলেও আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—‘আকাশই আমাদের ঘর’। এই দৃষ্টিভঙ্গিই ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গঠনের পথে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে।”
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেরা ক্যাডেটদের পুরস্কৃত করেন।
এদিনের অনুষ্ঠানে আকাশ গঙ্গা স্কাইডাইভিং টিম-এর স্কাইডাইভিং প্রদর্শনী, ‘শক্তি’ মহিলা এয়ার ওয়ারিয়র ড্রিল টিমের কুচকাওয়াজ, এবং সুখোই এসইউ-৩০এমকেআই, সারং হেলিকপ্টার ডিসপ্লে দল এবং সূর্যকিরণ অ্যারোবেটিক দল-এর বর্ণাঢ্য আকাশ প্রদর্শনী দর্শকদের মুগ্ধ করে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ট্রেনিং কমান্ডের এয়ার অফিসার কমান্ডিং-ইন-চিফ এস. শ্রীনিবাস, বিমানবাহিনী একাডেমির কমান্ড্যান্ট রাহুল ভাসিন-সহ বায়ুসেনার একাধিক শীর্ষ আধিকারিক।



















