জেএনইউতে এবিভিপি ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ, একাধিক ছাত্র আহত, উত্তরপ্রদেশ-বিহারের ছাত্রদের নিয়ে ‘আপত্তিকর মন্তব্য’ ঘিরে উত্তাল সভা

নয়াদিল্লি, ১৬ অক্টোবর : জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ)-তে মঙ্গলবার রাতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সাধারণ সভা ঘিরে বামপন্থী ও ডানপন্থী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। সংঘর্ষে একাধিক ছাত্রছাত্রী আহত হন, যাঁদের মধ্যে মহিলা ছাত্রও রয়েছেন। রাতভর টানটান উত্তেজনার পর বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে।

ঘটনাটি ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল সায়েন্স স্কুল ভবনে, যেখানে আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে চলা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেই সভাতেই এক বামপন্থী কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে উত্তরপ্রদেশ ও বিহার থেকে আগত ছাত্রদের নিয়ে ‘আপত্তিকর ও অবমাননাকর’ মন্তব্য করার অভিযোগ তোলে ডানপন্থী ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ ।

এবিভিপি-র সোশ্যাল সায়েন্স স্কুলের কাউন্সিলর অভিষেক রাই দাবি করেন, “সভায় একটি রিপোর্ট পড়া হচ্ছিল। তখনই এক বামপন্থী কাউন্সিলর বলেন— ‘উত্তরপ্রদেশ ও বিহার থেকে যারা এসেছে, তাদের জেএনইউ-তে থাকার যোগ্যতা নেই। তাদের অন্য কোথাও যাওয়া উচিত।’ এই মন্তব্যে সভায় প্রবল ক্ষোভ ছড়ায়। উপস্থিত ছাত্ররা ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলেন। কিন্তু মন্তব্যকারী কাউন্সিলর ও সভার চেয়ার— দুজনেই তা প্রত্যাখ্যান করলে হাতাহাতি শুরু হয়।”

রাই আরও অভিযোগ করেন, “বাম ছাত্ররা আমাদের ছাত্রদের উপর চেয়ার ছুঁড়ে মারে, লাঠি নিয়ে আক্রমণ করে। একাধিক ছাত্রের মাথা ও পিঠে গুরুতর চোট লাগে। এমনকি মহিলা ছাত্রদেরও শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়।”

ঘটনার পাল্টা ব্যাখ্যায় ছাত্র ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অভিযোগ করে, “এবিভিপি সভার গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট করতে চেয়েছিল। তারা সহিংসতা চালিয়ে সভা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। আমাদের একাধিক কর্মী, এমনকি মহিলা ছাত্রীরাও চোট পেয়েছেন।”

এসএফআই নেতা অলোক বলেন, “এবিভিপি নেতারা মঞ্চে উঠে পড়ে অকারণে সভা বাধাগ্রস্ত করে। ওরা কোথায় ছিল যখন জেএনইউ-র তহবিল কমানো হচ্ছিল? হোস্টেলের অবস্থা ভেঙে পড়ছে, ছাত্রদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ— এসব ইস্যুতে ওদের কোনও কথা নেই। ওরা প্রশাসনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্যাম্পাসকে কলুষিত করতে চাইছে।”

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষে উভয় পক্ষের একাধিক ছাত্রছাত্রী আহত হন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে সাফদারজং হাসপাতাল ও এইমস-এ চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ক্যাম্পাসে পৌঁছয় এবং রাতভর সতর্কতা জারি রাখে। যদিও এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষই লিখিতভাবে অভিযোগ জমা দেয়নি, বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সংঘর্ষ শুরু হয় বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার পর। প্রথমে তর্ক, তারপর ধাক্কাধাক্কি, আর শেষে মারধরে পরিণত হয় পরিস্থিতি। একজন ছাত্র বলেন, “সাধারণ আলোচনার মধ্যেই আচমকা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়, চিৎকার, গালাগাল, মারধর— কেউ সামলাতে পারছিল না।”

আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে জেএনইউ-র ছাত্র সংসদ নির্বাচন। আর সেই নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচন কমিশন গঠন করার সভাতেই এই উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেল। জেএনইউ-তে বরাবরই বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রভাব থাকলেও এবিভিপি-ও শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে। নির্বাচনের আগে এমন সংঘর্ষ পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ক্যাম্পাসে পুলিশের নজরদারি বজায় রয়েছে। প্লেইন ক্লথে পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় টহল দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য পাওয়ার পরই প্রয়োজনে শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।