কাঠমান্ডু/নয়াদিল্লি, ৯ সেপ্টেম্বর : নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) দেশজুড়ে ব্যাপক ও সহিংস বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেছেন। শত শত বিক্ষোভকারীর তার কার্যালয়ে প্রবেশ করে সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়ার পরই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। সোমবার থেকে দেশের বিভিন্ন শহরে শুরু হওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন ‘জেনারেশন জি’ তরুণদের নেতৃত্বে দ্রুত সহিংস আকার ধারণ করে। বিক্ষোভকারীরা মন্ত্রীর বাসভবনে আগুন দেওয়া, পাথর নিক্ষেপ ও সরকারি স্থাপনা ভাঙচুরসহ নানা ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা চালিয়ে যান। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ওলির ব্যক্তিগত বাড়ি বালকোটে আগুন ধরে গেলে পরিস্থিতি তীব্র আকার নেয়। বিক্ষোভের সময় পুলিশের গুলিতে অন্তত ১৯ জন নিহত হন এবং কয়েকশ মানুষ আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেও শান্তি ফেরেনি। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ে এবং অবশেষে প্রধানমন্ত্রী ওলির পদত্যাগে গতি আনে।
৭৩ বছর বয়সী কেপি শর্মা ওলি নেপালের রাজনৈতিক এক প্রভাবশালী ও বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তेरাথুম জেলায় জন্মগ্রহণকারী ওলি ছোটবেলায় তার মাকে হারান এবং দাদীর কাছে বড় হন। স্কুল জীবনে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং কারাবাসের সময় মাধ্যমিকের সমতুল্য আর্টস ইন্টারমিডিয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন। তার স্ত্রী রচনা শাক্যও একজন কমিউনিস্ট কর্মী। রাজনীতির জগতে তিনি ১৯৬৬ সালে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে সক্রিয় হন এবং ১৯৭০ সালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। একই বছর পঞ্চায়েত সরকারের হাতে গ্রেফতার হন এবং ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছর জেল খাটেন।
১৯৯০ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর তার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে এবং ১৯৯১ সালে তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি সিপিএন (ইউএমএল) দলের কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এবং বিভিন্ন সময় মন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৪ সালে তিনি সিপিএন-ইউএমএলের পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা নির্বাচিত হন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন।
বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় নেপালে ১৭ বছরে ১৪টি সরকার পরিবর্তন হয়েছে, যা দেশের গভীর রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত। গত সোমবার সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও এক্সে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় তরুণ প্রজন্ম ক্ষুব্ধ হয়ে সড়কে নেমে আসে। বিক্ষোভ দমন করতে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে প্রাণহানি ঘটে। বিভিন্ন মন্ত্রী ও নেতাদের বাড়িতে হামলার খবর পাওয়া যায়। ললিতপুরের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা গুরুংয়ের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, এবং অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু পাওডেলের বাড়িতে পাথর ছোঁড়া হয়। প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখাকের বাড়ি এবং সিপিএন (মাওবাদী কেন্দ্র) প্রধান পুষ্প কমল দাহালের বাসভবনেও আক্রমণ চালানো হয়।
তবে বিক্ষোভকারীদের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা এবং তার বাড়িতে প্রবেশ ঠেকানো হয়। বিভিন্ন জেলায় কারফিউ জারি করা হয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিক্ষোভ থামেনি। কাঠমান্ডুর নিউ বানেশ্বর, কালাঙ্কি চৌকসহ অন্যান্য এলাকায় কারফিউ উপেক্ষা করে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। রাউতাহাট জেলার চন্দ্রনিগাহাপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় এবং একটি পুলিশ যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই নেপালি কংগ্রেস নেতা ও কৃষি ও পশুপালন মন্ত্রী রামনাথ অধিকারী তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। তিনি জানান, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা না করে সরকার গুলি চালিয়ে স্বৈরতন্ত্রের পথ তৈরিতে মেতে উঠেছে। কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক গগন থাপা নিহতদের জন্য প্রধানমন্ত্রী ওলিকে দায়িত্ব নেয়ার ও পদত্যাগের আহ্বান জানান।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী ওলি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি ‘জেনারেশন জি’র সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তথ্যের অভাবে সৃষ্ট বিভ্রান্তি বলে উল্লেখ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের কোনও ইচ্ছা সরকারের নেই বলে আশ্বাস দেন। তিনি নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সহিংসতার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠনের কথা জানান।
অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেপালে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। ভারত নেপালের বন্ধু ও প্রতিবেশী দেশ হিসেবে পরিস্থিতি সংযম এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি, ভারতীয় সীমান্ত এলাকায়—বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলাসহ উত্তরপ্রদেশ, বিহার, উত্তরাখণ্ড ও সিকিমে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি) সীমান্তে অতিরিক্ত নজরদারি চালাচ্ছে এবং যানবাহন ও বাণিজ্যের উপর কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
পরিস্থিতি এখনও স্থিতিশীল হয়নি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা ও অশান্তি অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণআন্দোলন, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ এবং সরকারী পদত্যাগের মধ্য দিয়ে নেপালের ভবিষ্যত নিয়ে সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে ভারত এই সংকটের উন্নতি ও নেপালে শান্তির প্রত্যাবর্তন কামনা করছে।



















