News Flash

  • Home
  • বিদেশ
  • মধ্যপ্রাচ্যের নতুন তুর্রম খান: হুথি বিদ্রোহীরা কীভাবে আঞ্চলিক শক্তির কেন্দ্রে উঠে এলো
Image

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন তুর্রম খান: হুথি বিদ্রোহীরা কীভাবে আঞ্চলিক শক্তির কেন্দ্রে উঠে এলো

সানা, ৯ জুলাই : মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেখানে এক নতুন শক্তির নাম জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে—হুথি বিদ্রোহীরা। ইয়েমেনভিত্তিক এই গোষ্ঠী এতদিন আন্তর্জাতিক সংবাদে যতটা না আলোচিত ছিল, তার চেয়েও বেশি অবহেলিত ছিল রাজনৈতিক বিশ্লেষণে। কিন্তু গত এক বছরের সামরিক ও কৌশলগত কর্মকাণ্ড তাদের আর শুধুমাত্র একটি “স্থানীয় বিদ্রোহী” গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত রাখার সুযোগ দিচ্ছে না। এখন তারা রীতিমতো আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মাথাব্যথার কারণ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য। রেড সি-তে বারবার বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ইয়েমেনের উপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে হুথিরা এখন মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ‘পাওয়ার ব্রোকার’।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে হুথিরা রেড সি-তে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ১৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ হুথিদের টার্গেট হয়েছে। তাদের এসব হামলায় প্রায় ৪৪টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুটি জাহাজ—সম্পূর্ণভাবে ডুবে গেছে। এই হামলাগুলো কেবল ইয়েমেনের উপকূলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকে রীতিমতো জিম্মি করে তুলেছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা গ্রীক মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি ম্যাজিক সি’-এর। রেড সি-তে এটি দু’দফা হামলার শিকার হয়, যার ফলে জাহাজে আগুন ধরে যায়। জাহাজের ২২ জন নাবিক কোনোভাবে নিজেদের জীবন রক্ষা করে তীরে পৌঁছান।

হুথিদের এই অভিযান শুধু একটি সামরিক প্রদর্শনী নয়, বরং তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুট, বিশেষত রেড সি ও বাব-আল-মান্দেব চ্যানেলের মাধ্যমে ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যে যে কী ভয়াবহ বিঘ্ন ঘটাতে পারে, তা পরিষ্কার করে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিদের এই কৌশল কার্যত বিশ্বের অর্থনীতির নাড়ির উপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

রেড সি ও ইয়েমেন উপকূলে হুথিদের হামলার জবাবে ২০২৫ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে সামরিক অভিযানে নামে। ‘অপারেশন প্রোটেক্টেড গেটওয়ে’ নামের এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। আনুমানিক ৬০ বিলিয়ন ডলারের সামরিক রসদ এই অভিযানে ব্যবহার হয়, যার মধ্যে দুটি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও হুথিদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

মে মাস নাগাদ হুথিদের হামলার গতি কিছুটা কমলেও, জুন মাসে তারা আবার পুরোদমে ফিরে আসে। এই পুনরাবির্ভাব মার্কিন কৌশলের ব্যর্থতা এবং হুথিদের অভিযানে স্থায়িত্বের প্রমাণ দেয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিকভাবে ‘ডি-এস্কেলেশন’ বা পরোক্ষ সমঝোতার পথ খুঁজতে বাধ্য হয়।

ইসরায়েলও হুথিদের মোকাবেলায় সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেয়। হুথি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের হুদায়দা, রস ইসা এবং সালিফ বন্দর লক্ষ্য করে ইসরায়েল একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, এসব অভিযানে হুথিদের কোনো শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার নিহত হয়নি। এটা শুধু হুথিদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শক্তি নয়, বরং তাদের ইন্টেলিজেন্স এবং আত্মগোপনের দক্ষতাও তুলে ধরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের মতো এক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা শক্তির বিপরীতে এই ধরনের সক্ষমতা রীতিমতো বিস্ময়ের বিষয়। হুথিদের এই সামরিক স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্ব রক্ষার ক্ষমতা প্রমাণ করে, তারা এখন একটি সুসংগঠিত, লক্ষ্যনির্দিষ্ট ও কৌশলগতভাবে দক্ষ গোষ্ঠী।

যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেটেড স্ট্রাইকের ফলে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ অনেকটাই কমে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর মধ্যেও তারা ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল, এবং ইউএসভি-এর মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা স্থানীয়ভাবে অস্ত্র উৎপাদনের দিকে ঝুঁকেছে, এবং এমনকি ইরান কিংবা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে গিয়েও নিজেদের প্রযুক্তি দিয়ে আত্মনির্ভরতা অর্জন করেছে।

গবেষণা সংস্থা SIPRI-র একটি রিপোর্ট বলছে, হুথিরা বর্তমানে এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরি করছে, যা মধ্যম পাল্লার এবং এন্টি-শিপ ক্যাপাবিলিটিসহ অনেক উন্নত ফিচার নিয়ে আসছে। এটা তাদের সামরিক শিল্পের বিকাশেরই স্পষ্ট প্রমাণ।

যেখান থেকে হুথিদের উত্থান, সেই ইয়েমেনেও তারা এখনো প্রবল ক্ষমতায় রয়েছে। রাজধানী সানা, হুদায়দা এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলের একটি বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। শুধু তাই নয়, হুথিদের রাজনৈতিক প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও কার্যকরভাবে কাজ করছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, হুথিদের দীর্ঘমেয়াদী শক্তি অর্জনের জন্য এই ‘স্টেট-লাইক স্ট্রাকচার’ই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তারা কেবল বিদ্রোহী নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরির দিকেও এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেকে বলছেন, ইরান হুথিদের দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিকল্প জোট তৈরি করতে চাইছে—যার লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে চাপের মধ্যে রাখা।

সবকিছু বিচার করলে এটা পরিষ্কার যে, হুথি বিদ্রোহীরা এখন আর শুধু ইয়েমেনের গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই। তারা রেড সি-র মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটে বড় প্রভাব ফেলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো সামরিক পরাশক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ করছে, এবং নিজস্ব প্রযুক্তি ও সামরিক শিল্প গড়ে তুলছে। তারা শুধু প্রতিরোধ গড়ছে না, বরং একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত অবস্থানে পৌঁছে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদেরকে ‘আঞ্চলিক সুপার প্লেয়ার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতায় হুথিদের অস্তিত্ব এখন আর অবজ্ঞা করার মতো নয়—বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তারা এখন একটি নাম, যাকে হিসেব না করলে নীতিনির্ধারণ অসম্ভব হয়ে উঠবে।

Releated Posts

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সুরক্ষা নিয়ে বিএনপির প্রতিশ্রুতি প্রশ্নের মুখে: রিপোর্ট

ব্রাসেলস, ৯ এপ্রিল (আইএএনএস): বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ…

ByByNews Desk Apr 9, 2026

ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে আলোচনা

ঢাকা, ৯ এপ্রিল (আইএএনএস): ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হল।…

ByByNews Desk Apr 9, 2026

ভারত-আসিয়ান কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদারে আলোচনা

ম্যানিলা, ৯ এপ্রিল (আইএএনএস): ভারত ও এসিয়ান-এর মধ্যে সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত…

ByByNews Desk Apr 9, 2026

বাংলাদেশকে ‘বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে’ ইউনুস সরকার: আওয়ামী লীগের অভিযোগ

ঢাকা, ৮ এপ্রিল (আইএএনএস): হাম রোগের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে ১২৮ জনের বেশি মৃত্যুর প্রেক্ষিতে প্রাক্তন অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান মুহাম্মদ…

ByByNews Desk Apr 8, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top