উদয়পুর, ২৮ সেপ্টেম্বর: ত্রিপুরা ট্রাইবেল এরিয়া অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের (টিটিএএডিসি) অধীন ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সোমবার রণক্ষেত্রের চেহারা নিল গোমতী জেলার মহারানী এলাকা। ভোটগ্রহণ চলাকালীন মাতাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ওয়ারেংবাড়ি এলাকায় গুলিচালনার ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন তিপ্রা মথার প্রার্থী খচীন্দ্র রিয়াং (৩৬)। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে মহারানী-সহ সংলগ্ন এলাকায়। পরে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ চলাকালীন ইটের আঘাতে রক্তাক্ত হন গোমতী জেলার পুলিশ সুপার অনির্বাণ দাস। আহত হন এক সেক্টর অফিসারও। ভাঙচুর করা হয় উদয়পুরের মহকুমা পুলিশ আধিকারিক দেবাঞ্জলি রায়ের গাড়ি-সহ একাধিক যানবাহন। পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকায় বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে উদয়পুরে যান আইজি (আইনশৃঙ্খলা) মনচাক ইপ্পার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সকালে ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনের ভোটগ্রহণ মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হয়। তবে দুপুরের পর থেকে মাতাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এলংবাড়ি, দাতারাম ও ওয়ারেংবাড়ি-সহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। অভিযোগ, অমরপুরের দিক থেকে আসা এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ছয় থেকে সাতজনের একটি দল ওয়ারেংবাড়ি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে প্রবেশ করে ছাপ্পা ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেই সময় গুলিচালনার ঘটনা ঘটে এবং তিপ্রা মথার প্রার্থী খচীন্দ্র রিয়াং গুলিবিদ্ধ হন। এই ঘটনায় তাঁর কয়েকজন সমর্থকও আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে গুলিচালনার প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তসাপেক্ষ।
গুলিবিদ্ধ খচীন্দ্র রিয়াংকে দ্রুত উদ্ধার করে গোমতী জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর আঘাতের স্থান থেকে গুলি বের করা সম্ভব না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে আগরতলায় স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনায় আহত উদয় রাম রিয়াংয়ের চিকিৎসা গোমতী জেলা হাসপাতালে চলছিল।
গুলিচালনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মহারানী এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। উদয়পুরের মহারানী গামারিয়া উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনের স্ট্রংরুম করা হয়েছে। এই স্ট্রংরুমের কাছেই উদয়পুর–অমরপুর সড়কে অবরোধ শুরু করেন তিপ্রা মথার কর্মী-সমর্থকেরা। গুলিচালনার ঘটনায় জড়িত অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে তাঁরা বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান উদয়পুরের মহকুমা পুলিশ আধিকারিক দেবাঞ্জলি রায়, গোমতী জেলার পুলিশ সুপার অনির্বাণ দাস এবং সংশ্লিষ্ট থানার আধিকারিকদের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশবাহিনী। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলাকালীন উত্তেজিত জনতার একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন বলে অভিযোগ।
এই ঘটনায় ইটের আঘাতে মাথায় চোট পান পুলিশ সুপার অনির্বাণ দাস। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে গোমতী জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আহত পুলিশ সুপারকে দেখতে হাসপাতালে যান গোমতী জেলার জেলাশাসক। পাশাপাশি, হামলার ঘটনায় এক সেক্টর অফিসারও রক্তাক্ত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গিয়েছে।
অন্যদিকে, মহকুমা পুলিশ আধিকারিক দেবাঞ্জলি রায়ের গাড়ি-সহ কয়েকটি গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে উদয়পুরে পৌঁছান আইজি (আইনশৃঙ্খলা) মনচাক ইপ্পার। পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকরা গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন। এদিকে, গুলিবিদ্ধ তিপ্রা মথার প্রার্থী খচীন্দ্র রিয়াংকে দেখতে গোমতী জেলা হাসপাতালে যান টিটিএএডিসির এমডিসি সি. কে. জমাতিয়া, ত্রিপুরা বিধানসভার অধ্যক্ষ রামপদ জমাতিয়া এবং বিজেপির গোমতী জেলা সভানেত্রী সবিতা নাগ-সহ অন্যান্য নেতৃত্ব।
ঘটনার খবর পাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা. মানিক সাহা পুলিশ সুপার-সহ আহতদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন বলে জানা গিয়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি নির্দেশ দেন।
তিপ্রা মথার কর্মী-সমর্থকদের অবরোধের জেরে প্রায় দেড় ঘণ্টা উদয়পুর–অমরপুর সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। আটকে পড়েন বহু যাত্রী ও নিত্যযাত্রী। জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষকেও সমস্যায় পড়তে হয়। দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।
অন্যদিকে, মহারানী গামারিয়া উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নির্বাচনের স্ট্রংরুম থাকায় সেখানে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। স্ট্রংরুমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। পুলিশ আধিকারিকদের দাবি, পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকলেও বর্তমানে তা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এলাকায় চাপা উত্তেজনা বজায় রয়েছে।
ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটপ্রক্রিয়া চলাকালীন ভোটকেন্দ্রের কাছে গুলিচালনার ঘটনা এবং পরবর্তী সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এই ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিপ্রা মথার কর্মী-সমর্থকদের দাবি, গুলিচালনার ঘটনায় জড়িত অভিযুক্তদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
গুলিচালনা, পুলিশ আধিকারিকদের আহত হওয়া এবং একাধিক গাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনায় ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনকে ঘিরে মহারানী এলাকায় উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন গোটা ঘটনার তদন্ত, অভিযুক্তদের শনাক্তকরণ এবং নির্বাচনী স্ট্রংরুমের নিরাপত্তা বজায় রাখার দিকেই নজর রয়েছে প্রশাসনের।



















