নয়াদিল্লি, ৩ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): গত মাসে নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর ভয়াবহ বন্যা, যা হিমবাহ ধসের কারণে তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নেপালজুড়ে ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনে। ঘটনায় ১,০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় ৫,০০০ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর সামনে এসেছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে হিমালয়ের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা ফের স্পষ্ট হয়েছে।
বন্যার পর জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি এআই পরিকাঠামো, বিশেষ করে বৃহৎ ডেটা সেন্টারগুলির বিপুল বিদ্যুৎ ও জল ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, হিমালয়ের নিচে কথিত সার্ভার ফার্মের সঙ্গে হিমবাহ অস্থিতিশীলতার যোগ থাকতে পারে। তবে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় বিশেষজ্ঞরা মূলত এই দাবিগুলি খারিজ করেছেন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডেটা সেন্টার পরিকাঠামোয় চিনের বড় বিনিয়োগের কথা উঠে এসেছে। একইসঙ্গে হিমালয় অঞ্চলে একাধিক বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও গড়ে উঠছে। বড় বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। তবে হিমালয়ের পরিবেশের অবনতিতে এআই পরিকাঠামোর সরাসরি ভূমিকা এখনও বিতর্কের বিষয়।
‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ আশুতোষ তিওয়ারি বলেন, বন্যার সময় তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজে এআই-এর ভূমিকা খুবই সীমিত ছিল। তাঁর মতে, নেপালে এআই নিয়ে আলোচনা এখনও মূলত নীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, বাস্তব প্রয়োগে তার ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম।
চিনা সার্ভার ফার্মের কারণে হিমবাহ গলতে পারে—এমন অনলাইন দাবির বিষয়ে সাংবাদিক ও পরিবেশ-স্থায়িত্ব কৌশলবিদ কারিন ক্লোস্টারম্যান সম্প্রতি লেখেন, এই দাবির সঙ্গে হিমবাহ গলার সরাসরি যোগসূত্রের “বর্তমানে কোনও প্রমাণ নেই”। তবে বেজিং থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ক্লোস্টারম্যান একইসঙ্গে সতর্ক করেছেন, ডেটা সেন্টার বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সেই বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বাড়ে, যা বিশ্ব উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করে। তাঁর মতে, এই নির্গমন সীমান্ত মানে না এবং সামগ্রিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের গতিকে প্রভাবিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-কে ঘিরে একটি দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে এআই-নির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সতর্কতা দিতে এবং প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে, বিপুল শক্তি-নির্ভর ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ পরোক্ষভাবে সেই জলবায়ুগত ঝুঁকিই বাড়িয়ে দিতে পারে, যার ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এআই পরিকাঠামোর বিপুল বিদ্যুৎ ও জল চাহিদা পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। নেপালের মতো দেশে, যেখানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ইতিমধ্যেই ভঙ্গুর নদী ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলছে, সেখানে অতিরিক্ত সম্পদের চাহিদা পরিবেশগত ভারসাম্যকে আরও চাপে ফেলতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালের এক মন্ত্রী চিন, ভারত ও আমেরিকার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন এই ধরনের বিপর্যয়ে ভূমিকা রেখেছে।
‘কাঠমান্ডু পোস্ট’ আরও জানিয়েছে, নেপালের কূটনীতি বিশেষজ্ঞ মহেশ কুশওয়াহা একটি এআই-নির্মিত ইনফোগ্রাফিক শেয়ার করেছেন। সেখানে দেখানো হয়েছে—বিশ্বজুড়ে এআই-এর চাহিদা বাড়লে বিদ্যুতের ব্যবহার ও কার্বন নির্গমন বাড়তে পারে, যার ফলে হিমবাহ গলন ত্বরান্বিত হয়ে পাহাড়ি ভূখণ্ড অস্থিতিশীল হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ভোটেকোশির মতো বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে এআই-এর পক্ষে থাকা বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, দুর্যোগ প্রতিরোধেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ‘অ্যানালিটিক্স ইন্ডিয়া ম্যাগাজিন’-এর মতে, স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে এআই মডেলকে প্রশিক্ষিত করা সম্ভব, যা হিমবাহের গতিবিধি শনাক্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তনের ধরন চিহ্নিত করতে পারে। এর ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে আগাম সতর্কতা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, সেন্সর, স্যাটেলাইট ও পূর্বাভাসভিত্তিক অ্যালগরিদমকে একত্র করে তৈরি এআই-চালিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা হিমবাহের বাঁধ তৈরি হওয়া ও তা ভেঙে পড়ার মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু কাজে লাগাতে পারে। এর ফলে নদীর নিম্ন অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য মূল্যবান সময় পাওয়া যাবে।
হিমালয় যখন গড় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে, তখন এই অঞ্চলে এআই-এর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও জটিল হচ্ছে। জলবায়ু পর্যবেক্ষণ ও দুর্যোগ মোকাবিলায় এআই অভূতপূর্ব সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর পরিবেশগত খরচ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।



















