আগরতলা, ২৭ আগস্ট: বিদ্যুৎ গ্রাহকদের স্বার্থে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা নিশ্চিত করা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে রাজ্য সরকার ও বিদ্যুৎ দফতর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী রতন লাল নাথ।
বৃহস্পতিবার ত্রিপুরা বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে বিদ্যুৎ দফতরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, রাজ্যে ১৩২ কেভি সাবস্টেশনের সংখ্যা ১২টি থেকে বেড়ে ২১টি হয়েছে। আরও দুটি সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে। একইভাবে ৩৩ কেভি সাবস্টেশনের সংখ্যা ৪৪ থেকে বেড়ে ৭৫টি হয়েছে এবং আরও ১৮টি সাবস্টেশনের কাজ বর্তমানে চলছে।
রেলপথ-সংক্রান্ত বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় ২৭২ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি, বৃষ্টি ও ঝড়ের সময় বিদ্যুৎ পরিষেবা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য ৪০৮ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপন করা হয়েছে।
রতন লাল নাথ বলেন, ঝড়ের সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমাতে ১,৪৬৪ সার্কিট কিলোমিটার কভার্ড কন্ডাক্টর স্থাপন করা হয়েছে। আরও ৩৬০ কিলোমিটার কভার্ড কন্ডাক্টর স্থাপনের কাজ চলছে। লাইভ-লাইন মেইনটেন্যান্স এবং বিদ্যুৎ পরিকাঠামো নজরদারিতে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্যও ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল সাবস্টেশন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, ৭৯ টিলা পাওয়ার স্টেশন থেকে রুখিয়া পর্যন্ত নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজ চলছে, যার প্রায় ৭৫ শতাংশ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, গণ্ডাছড়ায় নতুন টাওয়ার লাইন স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে আগে এই ধরনের পরিকাঠামো ছিল না।
জনজতি অধ্যুষিত এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা সম্প্রসারণের বিষয়টিও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, আগে বিদ্যুৎ সংযোগবিহীন থাকা ১১,৬৯২টি রিয়াং পরিবারের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সূর্য ঘর মুফত বিজলি যোজনা-র আওতায় রাজ্যে প্রায় ১৭,৪০০টি নিবন্ধন হয়েছে। এর মধ্যে ৪,৫৪০টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ইতিমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় ১৫.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১.৫ লক্ষ পরিবারকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। রাজ্যে প্রায় চার লক্ষ পরিবার ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রসঙ্গে রতন লাল নাথ বলেন, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় রাজ্যের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তার প্রভাব পড়েছে।
*বিদ্যুতের শুল্ক বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন , বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ২০১০ সালে বিদ্যুতের শুল্ক ৬২ শতাংশ এবং তাদের শেষ আট বছরে মোট ১১৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এর বিপরীতে বর্তমান সরকার আট বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধি করেছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিদ্যুতের শুল্ক নির্ধারণ করে বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশন। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি পর্যালোচনা করার পর কমিশনই শুল্ক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আর সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার দায়িত্ব ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম ।
মন্ত্রী জানান, সর্বশেষ শুল্ক বৃদ্ধির পর রাজ্য সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত হস্তক্ষেপ করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন এবং অতিরিক্ত শুল্কের সম্পূর্ণ বোঝা ভর্তুকির মাধ্যমে বহনের সিদ্ধান্ত নেন। যেসব গ্রাহক ইতিমধ্যে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করেছেন, পরবর্তী বিদ্যুৎ বিলে সেই অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয় করে দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
স্মার্ট মিটার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন রাজ্যে স্মার্ট মিটার স্থাপনের কাজ চলছে। হিমাচল প্রদেশে প্রায় ৪৩ শতাংশ এবং জম্মু ও কাশ্মীরে প্রায় ৭৩ শতাংশ গ্রাহক স্মার্ট মিটারের আওতায় এসেছেন। ত্রিপুরায় ইতিমধ্যে প্রায় চার লক্ষ গ্রাহকের বাড়িতে স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
রতন লাল নাথের দাবি, ত্রিপুরায় ২০১৫ সালেই বামফ্রন্ট সরকারের আমলে স্মার্ট মিটার স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। প্রায় ৮০ কোটি টাকার স্মার্ট মিটার সংক্রান্ত একটি কাজের অর্ডারে আর্থিক অনিয়মের বিষয়ও ইন্ডিয়ান অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগ এর নজরে এসেছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা, বিদ্যুৎ পরিষেবার মান উন্নত করা এবং গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।


















