বিশালগড়, ৭ জুলাই: শনিবার গভীর রাতে বিশালগড়ের মুড়াবাড়ি–কড়ইমুড়া সড়কে সংঘটিত বহুল আলোচিত ছিনতাই ও কথিত অপহরণের ঘটনায় তদন্তে নেমে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঘটনাটি অপহরণ বা স্বর্ণালঙ্কার লুটের নয়; বরং নিষিদ্ধ কফ সিরাপ বহনকারী একটি গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নেশাজাতীয় সামগ্রী লুটের ঘটনা।
পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলের কাছাকাছি একটি বৈদ্যুতিন সামগ্রীর গোডাউনের সামনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। ওই ফুটেজে কালো রঙের একটি স্করপিও গাড়ি থেকে কফ সিরাপের কার্টন নামিয়ে অন্য একটি গাড়িতে তোলার দৃশ্য ধরা পড়েছে বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে। সেই ফুটেজের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে এবং তাদের খোঁজে তল্লাশি চলছে।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতরা হলেন ঘনিয়ামারা এলাকার পায়েল হুসেন ও সাগর মিয়া, ঝুটিন পোদ্দার, কবির হুসেন এবং মোসাদ্দেক হোসেন। এছাড়াও ঘটনায় ব্যবহৃত দুটি গাড়িও আটক করা হয়েছে। আরও কয়েকজন অভিযুক্তের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তে পুলিশের কাছে প্রাথমিকভাবে স্পষ্ট হয়েছে, এটি গাড়ি আটকে মহিলাদের অপহরণ বা স্বর্ণালঙ্কার লুটের ঘটনা নয়; বরং নেশা পাচার চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও লুটপাটের জেরে সংঘটিত ঘটনা। ফলে অপহরণ ও স্বর্ণালঙ্কার লুটের অভিযোগ দায়েরের পেছনের প্রকৃত কারণ এবং ঘটনাস্থলে থাকা দুই মহিলার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের বিষয়টিও এখন তদন্তের আওতায় এসেছে। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট হার্ডডিস্ক নিজেদের হেফাজতে নিলেও তা এখনও প্রকাশ্যে আনেনি।
তদন্তে উঠে এসেছে, শনিবার গভীর রাতে আগরতলা থেকে বক্সনগরের উদ্দেশ্যে দুটি গাড়িতে নিষিদ্ধ কফ সিরাপ নিয়ে রওনা হয় একটি চক্র। একটি গাড়িতে ছিলেন আশাবাড়ি এলাকার হৃদয় হোসেন। অন্য একটি কালো রঙের নম্বরবিহীন স্করপিও গাড়িতে ছিলেন পুঠিয়া এলাকার কথিত নেশা কারবারি জুয়েল মিয়ার বোনসহ আরও এক মহিলা।
সূত্রের দাবি, ওই চালানের খবর বক্সনগরেরই আরেকটি নেশা পাচার চক্র বিশালগড়ের পশ্চিমাঞ্চলে সক্রিয় একটি দুষ্কৃতী গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়। এরপর রাত প্রায় আড়াইটে নাগাদ প্রভুরামপুর এলাকায় বোলেরো পিকআপ ও একাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে ওত পেতে থাকা দুষ্কৃতীরা গাড়ি দুটির গতিরোধ করে। একটি গাড়ি পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও স্করপিওটি আটকে ফেলা হয়। অভিযোগ, সেখান থেকে ২৬ কার্টন নিষিদ্ধ কফ সিরাপ লুট করে নিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বিশালগড়কে করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে নেশাজাতীয় দ্রব্য পাচার করা হচ্ছে। তাদের দাবি, পুলিশের নীরবতার সুযোগে এই চক্র সক্রিয় রয়েছে। শনিবার রাতের ঘটনাও সেই পাচার চক্রেরই অংশ বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাকে ঘিরে আরও প্রশ্ন উঠেছে—প্রতিবারই কেন গভীর রাতে বক্সনগরমুখী গাড়িই তথাকথিত ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে?
এদিকে, সোমাইয়া নামে যে মহিলা থানায় অপহরণের অভিযোগ দায়ের করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধেও নেশা কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, আসামের বাজারীচড়া ও পাঠারকান্দি এলাকাতেও তাঁর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কিছু জানানো হয়নি।
এছাড়া তদন্তে দাবি করা হচ্ছে, ঘটনার দিন প্রথম গাড়িতে ছিলেন সোমাইয়ার ভাই, কথিত নেশা কারবারি জুয়েল মিয়া এবং তাঁর সহযোগী আশাবাড়ি এলাকার হৃদয় হোসেন। জুয়েল মিয়ার বিরুদ্ধে অতীতেও মহিলাদের ব্যবহার করে নেশাজাতীয় সামগ্রী পাচারের অভিযোগ উঠেছিল বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি। পাশাপাশি, ঘটনাস্থলে থাকা দুই মহিলার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যও তদন্তে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে, এলাকার বিধায়ক সুশান্ত দেব পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা বারবার বিশালগড়কে অপরাধ ও নেশা পাচারের করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে এলাকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিশালগড়কে নেশা কারবারিদের নিরাপদ করিডোর হিসেবে ব্যবহারের পথ চিরতরে বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তিনি।



















