নয়াদিল্লি, ৮ জুন: তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) অন্দরে ভাঙনের সঙ্কট আরও গভীর হয়েছে বলে দাবি উঠেছে। দলের বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে অন্তত ২০ জন দল থেকে আলাদা হয়ে একটি পৃথক গোষ্ঠী গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তাঁরা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ)-কে সমর্থন করবেন।
এই পরিস্থিতি দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জীর জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়ক দলের উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্রোহী শিবিরের নেতৃত্বে থাকা কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন, তাঁদের সঙ্গে ২০ জন সাংসদ রয়েছেন। যদিও মমতা-ঘনিষ্ঠ নেতাদের মতে, বিদ্রোহী সাংসদের সংখ্যা ১২ জনের বেশি নয়।
সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভুপেন্দ্র যাদব-এর দিল্লির বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অন্তত ১৪ জন তৃণমূল সাংসদ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও যোগ দেন।
বিদ্রোহী শিবিরের দাবি অনুযায়ী, বৈঠকে উপস্থিত সাংসদদের মধ্যে ছিলেন শতাব্দী রায়, জুন মালিয়া, দীপক অধিকারী, প্রসূন ব্যানার্জী, পার্থ ভৌমিক-সহ আরও কয়েকজন সাংসদ।
দিনভর দিল্লিতে দ্রুত রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে অংশ নেন, অন্যদিকে বিদ্রোহী সাংসদরা লোকসভায় পৃথক ব্লক গঠনের উদ্যোগ এগিয়ে নিয়ে যান।
সকালে তৃণমূলের প্রবীণ নেতা ও রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় দলের প্রাথমিক সদস্যপদ এবং রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন। তাঁর পদত্যাগ গ্রহণ করেছেন রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণন। পদত্যাগের কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের অভ্যন্তরে যে পরিস্থিতি চলছিল, তার জন্যই এই সিদ্ধান্ত।
বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাঁরা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে পৃথক আসন বিন্যাসের আবেদন জানিয়ে চিঠি জমা দিয়েছেন। সেই চিঠিতে ২০ জন সাংসদের সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে স্পিকারের দফতরের সূত্রে জানা গেছে, এখনও পর্যন্ত এমন কোনও চিঠি তাঁদের হাতে পৌঁছায়নি।
কাকলি ঘোষ দস্তিদারের দাবি, তিনি এখনও তৃণমূল সংসদীয় দলের চিফ হুইপ পদে বহাল রয়েছেন এবং সেই পদমর্যাদাতেই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। যদিও তৃণমূলের দাবি, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কল্যাণ ব্যানার্জীকে ইতিমধ্যেই নতুন চিফ হুইপ হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।
বিদ্রোহী শিবিরের সদস্য শর্মিলা সরকার বলেন, আমরা ২০ জন সাংসদ। পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের স্বার্থে এনডিএ-কে সমর্থন করা প্রয়োজন বলে মনে করছি। কাকলি দি আমাদের গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ শিবির বিদ্রোহীদের দাবি খারিজ করে দিয়েছে। তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছেন, বিজেপির পক্ষ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে এবং প্রকৃতপক্ষে মাত্র ১৩ জন সাংসদ ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র বিদ্রোহীদের উদ্দেশে কটাক্ষ করে বলেছেন, যাঁরা ২০২৪ সালে তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা যদি এনডিএ-র পক্ষে যেতে চান, তবে আগে সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়ুন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলত্যাগ বিরোধী আইনের বিধান এড়াতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন, অর্থাৎ কমপক্ষে ১৯ জন সাংসদ তাঁদের সঙ্গে থাকতে হবে। যদি সেই সংখ্যা তারা নিশ্চিত করতে পারে, তবে সংসদে তৃণমূলের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হবে এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।
উল্লেখ্য, গত মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর থেকেই দলের অন্দরে অসন্তোষ বাড়ছিল। এর আগে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রশ্নেও দলের বহু বিধায়ক প্রকাশ্যে নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।



















