নয়াদিল্লি, ২ ডিসেম্বর : ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, এখন থেকে সমস্ত স্মার্টফোনে “সঞ্চার সাথী” অ্যাপ ইনস্টল করা বাধ্যতামূলক। সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে তীব্র বিতর্ক। অনেকেই অ্যাপটিকে পেগাসাস স্পাইওয়্যারের সঙ্গে তুলনা করছেন। যদিও এটি অতিরঞ্জিত বক্তব্য, তবে সরকারের এই আদেশ বেশ কিছু প্রশ্ন উঠিয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে গোপনীয়তা এবং নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে।
কংগ্রেস সদস্য কীর্তি চিদাম্বরম এই সিদ্ধান্তকে “পেগাসাস প্লাস প্লাস” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “বিগ ব্রাদার আমাদের ফোনের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং আমাদের ব্যক্তিগত জীবনও নিয়ন্ত্রণে নেবে।” কেননা, কেন্দ্রীয় সরকার স্মার্টফোন নির্মাতাদের নির্দেশ দিয়েছে, যে তারা বাধ্যতামূলকভাবে “সঞ্চার সাথী” অ্যাপ ফোনে প্রি-ইনস্টল করবে এবং পুরনো ফোনে সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে এই অ্যাপ ইনস্টল করা হবে। অ্যাপটি কোনোভাবেই মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করা যাবে না।
কংগ্রেসের অভিযোগে যোগ দিয়ে সমাজবাদী দলের নেত্রী প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী রাইসাবায় লিখেছেন, “সঞ্চার সাথী অ্যাপের মাধ্যমে সরকার মোবাইল ফোনে পূর্ণ নজরদারি চালাবে, এটি এক ধরনের ‘বিগ বস’ নজরদারি মুহূর্ত।” সিপিআই(এম) সাংসদ জন ব্রিটাসও কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “পরবর্তী পদক্ষেপ অবশ্যই হবে—সব ভারতীয় নাগরিকের জন্য অ্যাঙ্কল মনিটর, কলার ও ব্রেইন ইমপ্লান্ট। তবেই সরকারের কাছে আমাদের ভাবনা এবং কাজের পুরোপুরি তথ্য থাকবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক তেহসিন পুনাওয়ালা এই পদক্ষেপকে “গোপনীয়তা ও স্বাধীনতার উপর তীব্র আক্রমণ” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, “এই অ্যাপটি প্রতিটি ফোনে প্রি-ইনস্টল করা এবং তা মুছে ফেলার সুযোগ না থাকাটা মানে সরকারের কাছে আমাদের কল, মেসেজ এবং লোকেশন ট্র্যাক করার ক্ষমতা থাকা।”
তবে, বিজেপি সাংসদ শশাঙ্ক মণি ত্রিপাঠি এই পদক্ষেপের পক্ষ থেকে সাফাই দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, “গোপনীয়তার কোন বিপদ নেই এবং সমস্ত ডেটা ডিজিটালি সুরক্ষিত থাকবে।” ত্রিপাঠি আরও বলেন, “আমি আইআইটি থেকে পড়েছি, আমি জানি কী ধরনের সাইবার আক্রমণ হচ্ছে… আমাদের ডেটা কখনও বেরিয়ে যাবে না এবং নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা ডিজিটালি সুরক্ষিত থাকবে।”
এবার আসুন, সঞ্চার সাথী অ্যাপের বিষয়ে বিস্তারিত জানি। সরকার বলছে, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হল “নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ভুয়া মোবাইল ফোন বাজারে আসা রোধ করা।” স্মার্টফোন নির্মাতাদের জন্য একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, তারা “সঞ্চার সাথী” অ্যাপটি মোবাইল ফোনের প্রথম ব্যবহার বা সেটআপের সময় ব্যবহারকারীর কাছে দৃশ্যমান এবং অ্যাক্সেসযোগ্য রাখবে এবং এর কার্যকারিতা কোনওভাবেই নিষ্ক্রিয় বা সীমিত করা যাবে না।
এর মানে, শুধু অ্যাপটি ফোনে থাকতে হবে না, তা ব্যবহারকারী মুছে ফেলতে বা নিষ্ক্রিয় করতে পারবেন না। এর ফলে, প্রশ্ন উঠছে—অ্যাপটি কি পেগাসাস স্পাইওয়্যারের মতো ব্যবহারকারীদের ফোনে নজরদারি চালাতে পারে?
যদিও “সঞ্চার সাথী” অ্যাপটি পেগাসাসের মতো বিশেষভাবে লক্ষ্যভিত্তিক স্পাইওয়্যার নয়, তবে এটি যে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে, তা অস্বীকার করা যায় না। অ্যাপটি ফোনের ক্যামেরা, কল লোগ, মেসেজ, নেটওয়ার্ক স্টেট ইত্যাদি অ্যাক্সেস করার জন্য অনুমতি চায়। যদিও এই সব অনুমতি অ্যাপটির মূল কাজ—ফোন খোঁজার কাজে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এই ধরনের ডেটা সংগ্রহের ক্ষমতা একসময় ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
এই পদক্ষেপ নিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি কি একটি সুরক্ষা পদক্ষেপ, নাকি এটি সরকারের জন্য একটি নতুন নজরদারি যন্ত্র হয়ে উঠবে? সময়ই বলবে, তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং রাজনৈতিক মহলে এই বিষয়ে তীব্র বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
——-

