কোচি, ১০ অক্টোবর — সবরিমালা মন্দিরের দ্বারপালকা (দ্বাররক্ষক) মূর্তিগুলোর সোনার পাত প্রলেপে চাঞ্চল্যকর গরমিল ধরা পড়েছে। শুক্রবার কেরালা হাইকোর্ট এই ঘটনার উপর কড়া অবস্থান নিয়ে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের নির্দেশ দিয়েছে এবং অবিলম্বে অপরাধমূলক মামলা রুজু করার নির্দেশ দেয়।
হাইকোর্টে দেবস্বম বিভাগের নজরদারি শাখার তরফে সিলবন্দি খামে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চিফ ভিজিল্যান্স ও সিকিউরিটি অফিসার ব্যক্তিগতভাবে রিপোর্টটি বিচারপতি রাজা বিজয়ারাঘবন এবং বিচারপতি কেভি জয়কুমার সমন্বিত বেঞ্চের কাছে জমা দেন।
বেঞ্চ জানায়, ২০১৯ সালে মন্দিরের দ্বারপালক মূর্তিগুলোর সোনার প্রলেপ দেওয়ার সময় প্রায় ৪৭৪.৯৯ গ্রাম সোনা নিখোঁজ হয়। বিষয়টিকে “মন্দির সম্পত্তির সঙ্গে বড় ধরনের অনিয়ম” হিসেবে আখ্যা দেয় আদালত।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ২০১৯ সালে দেবস্বম কমিশনারের নির্দেশে সোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল উন্নিকৃষ্ণণ পোত্তিকে। কিন্তু মজার বিষয়, সেই সময় রেকর্ড করা মহাজারে (বিবরণপত্র) সোনার কথা না লিখে কপার শিট (তামার পাত) বলে উল্লেখ করা হয়, যা স্বয়ং মন্দিরের তন্ত্রি (পুরোহিত) স্বাক্ষরিত।
পরে দেখা যায়, বেঙ্গালুরুর স্মার্ট ক্রিয়েশন্স নামক একটি সংস্থায় পাঠানো ১৪টি মূর্তিতে সোনার প্রলেপ ছিল, কিন্তু পোত্তির নির্দেশে তা খুলে নেওয়া হয়। পরে হিসেব মিলিয়ে দেখা যায়, প্রায় আধা কেজি সোনা নিখোঁজ।
সবরিমালা মন্দিরে সোনার প্রলেপ কেলেঙ্কারির তদন্তে উঠে এসেছে একের পর এক বিস্ময়কর তথ্য, যা প্রশাসনিক ত্রুটি এবং স্বচ্ছতার অভাবকে নগ্ন করে দিয়েছে। তদন্তে জানা যায়, বেঙ্গালুরুর সংস্থা স্মার্ট ক্রিয়েশন্স যে সোনা ফেরত পাঠিয়েছিল, তা উন্নিকৃষ্ণণ পোত্তি দেবস্বম বোর্ডে জমা দেননি। মূর্তিগুলি প্লেটিংয়ের জন্য চেন্নাই পাঠানো হলেও দেবস্বম কমিশনারকে কিছু জানানো হয়নি, এমনকি আদালতের অনুমতিও নেওয়া হয়নি। আরও চমকপ্রদ বিষয় হল, প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রায় ৪.৫ কেজি সোনার গরমিল ধরা পড়ে, সঙ্গে ছিল ৩৯ দিনের অস্বাভাবিক বিলম্ব। তদন্ত চলাকালীন একটি মূর্তির পাথরের বেদি উদ্ধার হয় পোত্তির বোনের বাড়ি থেকে, যা আরও সন্দেহ জোরালো করে। পাশাপাশি, পোত্তির লেখা একটি চিঠিতে অন্য একটি মূর্তির সোনা পুনর্ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যদিও বাস্তবে এমন কোনও অতিরিক্ত মূর্তি ছিল না বলে নিশ্চিত করেছে ভিজিল্যান্স।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেরালা হাইকোর্ট কড়া ভাষায় মন্তব্য করে একে গুরুতর প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে চিহ্নিত করেছে এবং একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর তদন্তের অগ্রগতি রিপোর্ট জমা দিতে হবে এবং ছয় সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করতে হবে। ভিজিল্যান্স রিপোর্ট রাজ্যের পুলিশ প্রধানের কাছে হস্তান্তর করতে বলা হয়েছে, যিনি সিট্-কে মামলা রুজু করে তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেবেন।
সবরিমালার মতো একটি পবিত্র ধর্মীয় স্থানে সোনা-সংক্রান্ত এ ধরনের কেলেঙ্কারি কেবল ভক্তদের বিশ্বাসে আঘাতই নয়, বরং প্রশাসনের গাফিলতিরও উদাহরণ। হাইকোর্টের তৎপরতায় আশা করা যায়, এই ঘটনার সত্য উদঘাটন হবে এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে। ঘটনাটি কেরালার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।


















