ক্ষমতা বদলে উগ্রবাদী যোগ, কেন্দ্রকে জড়িয়ে তোপ মানিক সরকারের

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ৩১ ডিসেম্বর৷৷ সরকার পরিবর্তনে কেন্দ্রের ভূমিকা চিন্তায় ফেলেছে বামেদের৷ তাই, ১৯৮৮ সালে উপদ্রুত আইনের সহায়তায় এবং ২০০০ সালে উগ্রবাদীদের ব্যবহার বামফ্রন্টকে পরাস্ত করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা ছিল, সেই ঘটনাগুলি উল্লেখ করে আসন্ন নির্বাচনেও একই ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিপিএম পলিটব্যুরো সদস্য তথা মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷ রবিবার বিবেকানন্দ ময়দানে বামফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নির্বাচনী জনসভায় তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকে এই ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপিকে বিঁধেছেন৷ তাঁর কথায়, লক্ষ্য এখন ক্ষমতার পরিবর্তন৷ তাই রাজ্যে আবারও দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা হচ্ছে৷ আসন্ন নির্বাচনে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করতে উগ্রবাদীরাও সহায়তা করবে, সেই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন মানিক সরকার৷
এদিন মানিক সরকার বলেন, রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকারের পতনের জন্য আগেও বহুবার চেষ্টা হয়েছে৷ তাতে সাময়িক সাফল্য মিলেছে ঠিকই, কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি৷ তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালে উপদ্রুত আইনের সহায়তায় এরাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছিল কংগ্রেস৷ তিনি উদ্বেগের সুরে বলেন, নির্বাচনের সময় তখন সেনা নামানো হয়েছিল৷ গণনাকেন্দ্র দখল করা হয়েছিল৷ কিন্তু, পাঁচবছর পর জনগণ এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল৷ তাতেই তাদের পতন হয়েছিল, বলেন মানিক সরকার৷ সাথে যোগ করেন, জনগণের রায়ে কংগ্রেসকে পরাস্ত করে বামফ্রন্ট ক্ষমতা দখল করলেও, ২০০০ সালে তদানীন্তন বাজপেয়ী সরকারের মদতে এডিসি দখল নিয়েছিল আইপিএফটি৷ তিনি বলেন, উগ্রবাদীদের রাজনৈতিক মুখোস হচ্ছে আইপিএফটি৷ তখন এডিসি নির্বাচনে কেন্দ্রের মদতে উগ্রবাদীরা ক্ষমতাচ্যুত করতে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছিল৷ আসাম রাইফেলসের তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার উগ্রবাদীদের মদত দিয়েছিল৷ তাই, বন্দুকের নলের মুখে আইপিএফটি এডিসি দখল নিয়েছিল৷ কিন্তু, এডিসিতে তারা পাঁচ বছরও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি, বিদ্রুপ করেন মানিক সরকার৷ তাঁর কথায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে বামফ্রন্ট পুণরায় ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়েছিল৷
মানিক সরকার বলেন, আবারও রাজ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্র হচ্ছে৷ উগ্রবাদীদের রাজনৈতিক মুখোস আইপিএফটির শ্লোগান আগে ছিল স্বাধীন ত্রিপুরা৷ কিন্তু, এই শ্লোগান তাদের জনবিচ্ছিন্ন করেছে৷ তাই এখন তারা পৃথক রাজ্যের নামে নতুন শ্লোগান দিচ্ছে৷ শ্রীসরকার অভিযোগ এনে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করেই আইপিএফটি পৃথক রাজ্যের দাবিতে জাতীয় সড়ক ও রেল ১১ দিন অবরোধ করে রেখেছিল৷ শুধু তাই নয়, মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করে বিজেপি অস্থিরতা কায়েম করতে চেয়েছিল, তোপ দাগেন মানিক সরকার৷ কিন্তু, প্রচন্ড ধৈর্য্যের সাথে সমস্ত অস্থিরতা মোকাবেলা করা হয়েছে, বলেন তিনি৷
শ্রীসরকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এধরনের চেষ্টা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী অবগত নন এমনটা ভাবা ঠিক হবে না৷ তাঁর কথায়, প্রধানমন্ত্রী জ্ঞাতসারেই সব হচ্ছে৷ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও এসমস্ত বিষয় সম্পর্কে জানতেন৷ তিনি বলেন, রাজ্যে দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা হচ্ছে৷ কখনও জাতি-উপজাতি, আবার কখনও ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা চালিয়েছে আরএসএস মদতপুষ্ট বিজেপি৷ এদিন বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে মানিক সরকার বলেন, ওঁরাই মন্দির ভাঙ্গছেন৷ মন্দিরের মূর্তি ভাঙ্গার দায়ে যারা গ্রেফতার হয়েছে, তাদের স্বীকারোক্তিতেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে৷ তিনি বলেন, হিন্দুদের কোনও ধর্মগুরু ধর্মান্তকরণের কথা বলেন না৷ কিন্তু, এখন যা চলছে, তাতে শুধুমাত্র অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টাই হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন৷ তবে, রাজ্যে এসব চেষ্টা সফল হচ্ছে না৷ তবু এখনও তাদের প্রচেষ্টা জারি আছে, বলেন মানিক সরকার৷ তাই তিনি জনগণকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে এধরনের সমস্ত চেষ্টা মোকাবিলা করতে বলেন৷ তাঁর দাওয়াই, এলাকায় কে আসছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কি করছেন জনগণকে সবই লক্ষ্য রাখতে হবে৷ তা হলে বিপর্য্যয় ঘটে যাবে, আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন মানিক সরকার৷
কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকাররের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে ত্রিপুরার জনগণকে এর উপযুক্ত জবাব দিতে বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷ নরেন্দ্র মোদীর গুজরাট মডেল ফ্লপ করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন৷ ভাষণ রাখতে গিয়ে পলিটব্যুরো সদস্য তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বলেন, বরাবরই কেন্দ্রীয় সরকার ত্রিপুরা বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে আসছে৷ এখনও চক্রান্ত করে চলছে৷ তবে চক্রান্ত কখনওই সফল হয়নি৷ কেন্দ্রে মোদী সরকার আসার পর থেকে বামশাসিত ত্রিপুরাকে আর্থিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে৷ উন্নয়ন খাতে অর্থ বরাদ্দ করা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷ এমজিএনরেগায় ত্রিপুরা ইতোপূর্বে প্রথম হলেও এখন মাত্র ৪২ দিনের কাজের অনুদান দেওয়া হয়েছে৷ কিন্তু সেই অর্থও মিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে না৷ অস্থির বাতাবরণ সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে৷ মানিক সরকার বলেন, নরেন্দ্র মোদী যে গুজরাট মডেলের কথা বলে সারা দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তা ফ্লপ হয়েছে৷ সে রাজ্যের মানুষ তা প্রত্যাখ্যান করছে৷ নির্বাচনে তার প্রমাণ মিলেছে৷ কেন্দ্রের পুরো মন্ত্রিসভার গুজরাটে গিয়ে বসে থেকেও কোনও সাফল্য আনতে পারেনি৷ ধর্মের কথা বলে সাম্প্রদায়িকতার উস্কানি দিয়েও কোনও লাভ হয়নি৷ নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্বাচনকে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল৷ কিন্তু মানুষ জবাব দিয়ে দিয়েছে৷
মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার আরও বলেন, দেশের বিজেপি সরকারের ভুল নীতির কারণে বেকারত্ব বাড়ছে, গো-রক্ষার নামে সংখ্যালঘু এবং দলিতদের খুন করা হচ্ছে৷ কে কী খাবেন তাও ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে৷ বুদ্ধিজীবীরা কী লিখবেন তা ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে৷ এ ধরণের ফ্যাসিস্ট সরকারকে ত্রিপুরার জনগণই উপযুক্ত জবাব দিতে পারবেন৷ আর ত্রিপুরার জনগণ অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই দেশের সংগ্রামী মানুষ কিছুটা আত্মবিশ্বস জোগাতে পারবেন৷