আনোয়ারার মৃত্যু রহস্য নিয়ে সহপাঠীদের মিছিল ও অবরোধে উত্তাল রাজধানী, ময়না তদন্তের জন্য প্রশাসন কবর থেকে তুলে নিল মৃতদেহ

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৩ এপ্রিল৷৷ মহিলা পলিটেকনিকের প্রথম বর্ষের ছাত্রী আনোয়ারা চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবীতে বৃহস্পতিবার দিনভর রাজধানী আগরতলা উত্তাল হয়ে উঠে৷ দুপুর বারোটা নাগাদ তৃণমূল ছাত্র পরিষদ আচমকা পুলিশ সদর কার্য্যালয়ে ঢুকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে৷ এদিকে, মহিলা পলিটেকনিক কলেজের ছাত্রীরা রাজধানী আগরতলায় বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত করে৷ চাপের মুখে প্রশাসন এদিন আনোয়ারার মৃতদেহ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে৷ কিন্তু, তাতেও সন্তুষ্ট নয় মহিলা পলিটেকনিকের ছাত্রীরা৷ সন্ধ্যায় প্যারাডাইস চৌমুহনীতে পথ অবরোধ করে তারা দাবী জানায় লিখিত আকারে সুষ্ঠু তদন্ত এবং যদি ময়না তদন্তে খুন করা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে দোষীকে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে৷ এদিন সন্ধ্যায় তাদের সাথে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরাও অবরোধ আন্দোলনে শামিল হয়৷ অবরোধের কারণে প্যারাডাইস চৌমুহনী সহ সংলগ্ণ এলাকায় তীব্র যানজট দেখা দেয়৷ খবর পেয়ে পশ্চিম জেলার জেলা শাসক ডঃ মিলিন্দ রামটেকে, সদর মহকুমা শাসক সমিত রায় চৌধুরী, ডিআইজি উত্তম কুমার নাথ অবরোধস্থলে পৌঁছান৷ তার আগে মহিলা পলিটেকনিকের প্রিন্সিপাল ডি এল রাও অবরোধ স্থলে পৌঁছে ছাত্রীদের অবরোধ প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানান৷ কিন্তু, প্রিন্সিপালের অনুরোধে ছাত্রীরা আরও ক্ষেপে যায়৷ প্রিন্সিপালকে সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য একপ্রকার হুশিয়ারী দেয় ছাত্রীরা৷ অবশেষে পশ্চিম জেলার জেলা শাসকের লিখিত প্রতিশ্রুতিতে ছাত্রীরা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়৷ এদিন, জেলা শাসক অবরোধকারীদের জানান, আনোয়ারা চৌধুরীর মৃতদেহ ময়না তদন্ত করা হয়েছে৷ রিপোর্ট হাতে আসতে দু-এক দিন সময় লাগবে৷ ময়না তদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর যদি এই ঘটনায় অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায় তাহলে নিশ্চয় এর সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে৷ শুধু তাই নয় দোষিকে গ্রেপ্তার করে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও ব্যবস্থা করা হবে৷ জেলা শাসকের কাছ থেকে লিখিতভাবে এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে অবরোধকারীরা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়৷
এদিন দুপুরে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কর্মীরা আচমকা আনোয়ারা চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের দাবীতে পুলিশ সদর কার্য্যালয়ে চড়াও হন৷ পুলিশ সদর কার্য্যালয়ের ভিতরে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন৷ তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কর্মীদের এই ধরনের কার্যকলাপের বিষয়ে আরক্ষা প্রশাসনের কাছে কোন খবর ছিল না৷ ফলে, আচমকা তারা পুলিশ সদর কার্য্যালয়ে চড়াও হলে অপ্রস্তুত পুলিশ কর্তারা সঙ্গে সঙ্গে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি৷ আই জি আইন শৃঙ্খলা কে ভি শ্রীজেশ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সর্মিষ্ঠা চক্রবর্ত্তী তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কর্মীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন৷ তাদের দাবী আনোয়ারার মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে৷ এই দাবীতে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কর্মীরা অনবরত শ্লোগান দিতে থাকে পুলিশ সদর কার্য্যালয়ে৷ অবশেষে পুলিশ স্বতপ্রণোদিত ভাবে আনোয়ারার মৃত্যুর ঘটনায় একটি মামলা নেয়৷ পাশাপাশি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কর্মীদের জানানো হয় আনোয়ারার মৃতদেহ কবর থেকে তোলে ময়না তদন্ত করা হবে৷ এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কর্মীরা পুলিশ সদর কার্য্যালয় থেকে বেরিয়ে যান৷
চাপের মুখে আরক্ষা প্রশাসন এদিন কবিরাজটিলা স্থিত কবর থেকে আনোয়ারার মৃতদেহ তোলে জি বি হাসপাতালে নিয়ে যায় ময়না তদন্তের জন্য৷ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা নাগাদ ময়না তদন্ত করা হয়েছে৷
উল্লেখ্য, গত রবিবার মহিলা পলিটেকনিকের প্রথম বর্ষের ছাত্রী আনোয়ারা চৌধুরীর মৃত্যু হয়৷ তার মামার বাড়ির সদস্যদের বক্তব্য প্যাটে ব্যথার জন্য তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল৷ এর থেকেই তার মৃত্যু হয়েছে৷ চিকিৎসকরা ডেথ সার্টিফিকেটে লিখেছেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আনোয়ারার মৃত্যু হয়েছে৷ কিন্তু, পেটের ব্যথা থেকে কয়েক ঘন্টার মধ্যে তার মৃত্যু কীভাবে হল এনিয়েই সন্দেহ দেখা দেয়৷ সন্দেহের পেছনে আরও একটি কারণ হল, সম্পত্তির জন্য তার মামা- মামির সাথে মনমালিন্য চলছিল৷ কারণ, যে বাড়িতে আনোয়ারা থাকত তার অর্ধেক আনোয়ারার দিদা তার নামে লিখে দিয়েছিলেন৷ প্রাপ্তবয়স্ক হলেই সম্পত্তির মালিকানা আনোয়ারা আইনত পেয়ে যাবে৷ তাতেই মামা-মামির সাথে দীর্ঘদিন ধরে অশান্তি চলছিল৷ মা মারা যাওয়ার মামার বাড়িতে থেকেই পড়াশুনা করত আনোয়ারা৷ তবে, তার পড়াশুনা সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতেন তার এক দিদা৷ মামার বাড়িতে তাকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না বলেও অভিযোগ৷ এই সমস্ত কারণে অনোয়ারা প্রায়ই মনমরা থাকতো বলে সহপাঠীরা জানিয়েছে৷ এদিকে, আনোয়ারার মৃত্যুর পর তার মোবাইল ফোন গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ঘিরেও সন্দেহ দেখা দিয়েছে৷ সম্পূর্ণ সুস্থ আনোয়ারার হঠাৎ মৃত্যু কোন ভাবেই তার সহপাঠীরা মেনে নিতে পারছে না৷ ফলে, এই ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত দাবী করে মঙ্গলবার পশ্চিম আগরতলা মহিলা থানায় ডেপুটেশন দেয় তার সহপাঠীরা৷ এরপর থেকে ক্রমাগত বিক্ষোভ আন্দোলন চলছে আনোয়ারার মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য৷