নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৫ মার্চ৷৷ ব্রিটিশ জমানা থেকে আসা পৃথক রেল বাজেট প্রথমবারের মত সাধারণ বাজেটের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে৷ কিন্তু, শুধুমাত্র এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে রেল বাজেট ঐতিহাসিক হয়ে যায় না৷ রেল বাজেটকে তখনই সম্পূর্ণ বা পরিণত বলা যেত যদি তার মধ্যে একটা সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গী, সুদূর প্রসারী এবং জনমুখী দিশা থাকত৷ সেই দিশার মধ্য দিয়ে সারা দেশকে একটা পরিবার হিসাবে গড়ে তোলার, দেশের কৃষি অর্থনীতিকে সহয়তা প্রদান, শিল্প সম্প্রসারণের লক্ষ পূরণে প্রয়োজনীয় যোগদান সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা৷ যাত্রী ও পণ্য পরিবহণে আরো স্বচ্ছন্দ বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ছক আশা করা গিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন সাংসদ জীতেন্দ্র চৌধুরী৷ লোকসভায় রেল বাজেটের উপর শ্রীচৌধুরী বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই কথাগুলি বলেন৷ তিনি আরও বলেন, অত্যন্ত খেদের সাথে বলতে হয় ভারতীয় রেলের ভাবমুর্তি আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? একটি বার্ধক্যে জর্জরিত প্রকল্প৷ যার সারা অঙ্গে বয়সের ছাপ৷ একটি অতি অনিয়মিত বাহনের বাহিনী৷ অপরিচ্ছন্নতা এবং অস্বাস্থকরতার প্রতীক৷ একটি অতি অলাভজনক ব্যবস্থাপনার মডেল৷ ক্রমবর্ধমান যাত্রী এবং পণ্য পরিবহনে অপরাগ এবং চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনার একটি নিদর্শনে পরিণত হয়েছে ভারতীয় রেল৷
শ্রীচৌধুরী তাঁর ভাষণে আরও বলেন, আশা করা হয়েছিল বড় বড় ভাষণ ত্যাগ করে মোদি সরকার ভারতীয় রেলের এই দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ে যত্নবান হবে৷ দুই একটি পদক্ষেপ ব্যতিরেকে বর্তমান সরকারও পুরনো পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে৷ ২০১৭-১৮ সালের বহু চর্চিত বাজেটেও তারই প্রতিফলন ঘটেছে৷ মূল সমস্যার দিকে নজর না দিয়ে বাজেটে এক লক্ষ কোটি টাকার বেশী খরচ করে বুলেট ট্রেন চালানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে৷ অথচ এই অর্থ খরচে ভারতীয় রেলের গতি বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা বিধানে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ ছিল৷ এতে লক্ষ লক্ষ যাত্রীর বহু সময় বাঁচানো যেত এবং দেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় গতি সঞ্চার করা যেত বলে জানিয়েছেন জীতেন্দ্র চৌধুরী৷
তিনি বলেন, রেলকে ভারতীয় অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করানো এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণে একটি বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে৷ রেল এবং অন্যান্য আবশ্যক পরিকাঠামো না থাকার কারণেই উত্তর পূর্বাঞ্চল আজ অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে জীতেন্দ্র চৌধুরী মন্তব্য করেছেন৷ তিনি বলেন, এই অঞ্চলের বামপন্থী দল ও সংগঠন সমূহ দুর্বার লড়াইয়ের ফলে বিগত আড়াই দশকে ত্রিপুরা সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলে কিছু প্রকল্প মঞ্জুর হয়েছে৷ রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভুর ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং রেল মন্ত্রকের দক্ষ অফিসার ও কর্মীদের অক্লান্ত প্রয়াসে বিগত কয়েক বছরে প্রকল্প রূপায়ণে কিছুটা গতি সঞ্চার হয়েছে বলে শ্রীচৌধুরী অভিমত ব্যক্ত করেছেন৷ কিন্তু সামগ্রিক বিকাশের প্রয়োজনীয়তায় এই সাফল্যে আত্মতুষ্টির কোন সুযোগ নেই৷
সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক বিকাশের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার সাথে কয়েকটি প্রকল্প বিবেচনার জন্য জীতেন্দ্র চৌধুরী দাবী জানিয়েছেন৷ দাবীগুলি হচ্ছে, ২০২০ সালের মধ্যে উত্তর পূর্বাঞ্চলের সমস্ত রাজ্যের রাজধানীতে রেল পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা৷ নির্মিয়ামান আগরতলা- সাব্রুম প্রকল্পকে চিটাগাঙ বন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারণে উদ্যোগ গ্রহণ করা৷ প্রস্তাবিত আগরতলা-আখাউড়া প্রকল্পকে ঢাকা পর্যন্ত সম্প্রসারণের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনা শুরু করা এবং ভবিষ্যতে ঢাকা হয়ে কলকাতা যোগাযোগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা৷ মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল থেকে বর্মার রাজধানী ইয়াঙ্গন বা রেঙ্গুন পর্যন্ত রেল সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া৷ এদিকে, সাংসদ জীতেন্দ্র চৌধুরী দেশের প্রান্তির রাজ্য ত্রিপুরা সম্পর্কে বেশ কয়েকটি দাবী রেখেছেন৷ এগুলি হচ্ছে আগরতলা পর্যন্ত সপ্তাহে দুটি রাজধানী এক্সপ্রেস চালু করা৷ আগরতলা থেকে কলকতা দুটি দৈনিক এক্সপ্রেস ট্রেন চালু করা৷ আগরতলা থেকে চেন্নাই একটি ট্রেন চালু করা৷ আগরতলা থেকে বেঙ্গালুরু একটি সাপ্তাহিক ট্রেন চালু করা৷ ত্রিপুরাতে একটি রেলওয়ে ডিভিশন স্থাপন করা৷ আগরতলায় একটি রেলওয়ে নিয়োগ কেন্দ্র স্থাপন করা৷ ত্রিপুরার অভ্যন্তরে এবং ত্রিপুরা থেকে বহির্রাজ্যে চলাচলকারী সমস্ত ট্রেনের পরিষেবা উন্নত করা৷ রাজ্যের মধ্যে যেসমস্ত জেলা সদর বর্তমান এবং প্রস্তাবিত রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত নয় সেগুলিকে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের অধীনে অন্তর্ভূক্ত করা৷ রাজ্যে যেসমস্ত রেল ক্রসিং অরক্ষিত সেগুলিতে ভেন্ডার পাস এবং ওভার ব্রিজ নির্মাণ করা৷ ত্রিপুরাতে একটি রেল হাসপাতাল স্থাপন করা৷ রাজ্যে রেল ইঞ্জিনিয়ারীং সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের জন্য একটি আইটিআই স্থাপন বা চালু যে কোন একটি আইটিআইকে চিহ্ণিত করা৷
সাংসদ জীতেন্দ্র চৌধুরী সরকারের কাছে আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকার রেলকে সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্ত করে তার যাবতীয় দূর্বলতা দূর করার মাধ্যমে দেশ নির্মাণের অন্যতম সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে৷



