নোট বাতিলে নয়, রাজনৈতিকভাবে জনবিচ্ছিন্ন করা হলেই সন্ত্রাসবাদ দমন সম্ভব ঃ মুখ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১১ জানুয়ারি৷৷ নোট বাতিল করে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়৷ রাজনৈতিক ভাবে

খোয়াইয়ে জনসভায় বক্তব্য রাখেন সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্য মানিক সরকার৷ ছবি নিজস্ব৷
খোয়াইয়ে জনসভায় বক্তব্য রাখেন সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্য মানিক সরকার৷ ছবি নিজস্ব৷

তাদের জনবিচ্ছিন্ন করতে পারলেই সন্ত্রাসবাদ দমন সম্ভব বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্য তথা মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷ তিনি আরও বলেন, নোট বাতিলের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন এবং কালো টাকা উদ্ধারও সম্ভব নয়৷ মানিকবাবুর অভিযোগ, প্রাক্ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়ে জনগণের চিন্তাধারা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বিমুদ্রাকরণের উদ্যোগ নিয়েছে মোদি সরকার৷বুধবার খোয়াই সরকারি দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ের মাঠে টিওয়াইএফআই’র কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশ্য সমাবেশে এভাবেই কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনায় মুখর হন সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্য তথা রাজ্যের মুুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার৷ এদিন তিনি এসবের পাশাপাশি নগদহীন লেনদেন পদ্ধতি চালু করা নিয়ে সারা দেশে যেভাবে মাতামাতি শুরু হয়েছে, বস্তুত ভারতের মত দেশে অর্থনীতির নয়া এই পন্থা সকলের পক্ষেই সহজলভ্য হয়ে উঠবে এমনটা মনে করার কোন কারণ নেই বলে দাবি করেন৷
মুখ্যমন্ত্রী এদিন নোট বাতিলে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় কোন সদর্থক ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে দাবি করেন৷ তাঁর বক্তব্য, ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল হলে সন্ত্রাসবাদীরা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে, এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই৷ কারণ, সন্ত্রাসবাদীরা লেনদেনে নগদ নোটের বদলে অনলাইন পদ্ধতিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে৷ সন্ত্রাসবাদ দমনে মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শ, সন্ত্রাসবাদীদের রাজনীতিগতভাবে জনবিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিতে হবে৷ পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীকেও অধিক স্বাধীনতা দিতে হবে৷ কারণ, এই ধরনের পদ্ধতিগুলি অবলম্বন করেই ত্রিপুরায় সন্ত্রাসবাদ দমন সম্ভব হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জোর গলায় দাবি করেন৷
এদিনের সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কংগ্রেস এবং বিজেপিকে একই আসনে বসিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ তাঁর বক্তব্য, নীতিগতভাবে কংগ্রেস এবং বিজেপি এই দুই দলের মধ্যে কোন ফারাক নেই৷ আচ্ছে দিনের স্বপ্ণ বাস্তবে মুখ থুবড়ে পড়েছে৷ তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, বিজেপি সরকার কালো টাকার মালিকদের জন্য একের পর এক সুযোগ করে দিতেই ব্যস্ত৷ কারণ, এই পঁুজিপতিরাই গত নির্বাচনে বিজেপির নির্বাচনী খরচ বহন করেছিল৷ এবিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে কালো টাকার মালিকদের সুযোগ করে দিয়েছেন৷ যাতে তারা তাদের কালো টাকা সাদা করতে পারেন৷ নোট বাতিলের পেছনে কেন্দ্রের উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতি দমন, কালো টাকা উদ্ধার, জাল নোট রোধ এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা৷
এদিন তিনি আরো বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার কোনটাই পূরণ করেনি৷ ফলে, ক্রমশ মানুষ বিজেপির উপর অসন্তোষ্ট৷ তাই দেশের জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যই নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷ এখন আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ক্যাশলেস পদ্ধতি, কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ তিনি বলেন, একটি কার্ড দেখিয়ে জিনিস কেনার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে বিজেপি সরকার৷ কিন্তু গোটা বিশ্বে দুয়েকটি রাষ্ট্র বাদ দিলে আর কোথাও এমন ব্যবস্থা চালু নেই৷ মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন এদেশে এই পদ্ধতি চালু করতে গেলে সর্বত্র বিদ্যুৎ পৌঁছাতে হবে৷ খুলতে হবে ব্যাঙ্ক৷ পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নতি করতে হবে৷ তবে, মুখ্যমন্ত্রীর দৃঢ় বিশ্বাস এসবের কোন কিছুই এদেশে প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না৷ তাই তিনি মনে করেন, নগদ টাকা ছাড়া আদান-প্রদান, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি-শিল্প, বেতন-ভাতা কোনটাই সম্ভব নয়৷
মুখ্যমন্ত্রী এদিন প্রশ্ণ তুলে বলেন, নোট বাতিলে মূলত কারা সর্বাধিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন৷ তাঁর দাবি, টাটা, বিড়লা, ডালমিয়া, রিলায়েন্স, আম্বানি, আদানি কেউই নোট বাতিলে কোন সমস্যায় পড়েননি৷ কেবল সাধারণ জনগণ নোট বাতিলের জেরে ভোগান্তির মুখে পড়েছেন৷ শতাধিক মানুষ নোট বাতিলের জেরে মারা গেছেন৷ কৃষক, ক্ষেত মজুর, দিনমজুর, জুমিয়া, ছোট দোকানদার যারা দিন আনে দিন খান তারাই মূলত এখন মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন৷ এছাড়াও এদিন কেন্দ্র ও রাজ্য সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে চরম অসন্তোষ ব্যক্ত করেন মুখ্যমন্ত্রী৷
সাম্প্রদায়িক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে প্রতিহত কর, জারি রাখ উন্নয়নের লড়াই এই শ্লোগানকে সামনে রেখে খোয়াই সরকারী দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ের মাঠে এক প্রকাশ্য সমাবেশের মধ্য দিয়ে ১১-১৩ই জানুয়ারী তিন দিনব্যাপী টিওয়াইএফ পঞ্চদশ কেন্দ্রীয় সম্মেলনের সূচনা হল বুধবার৷ এদিন দুপুর ১টায় খোয়ায় নব নির্মিত টাউন হলের সামনে সংগঠনের পতাকা উত্তোলন ও শহীদ বেদীতে মাল্যদান কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হয়৷ এরপর দুপুর আড়াইটায় শুরু হয় সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশ৷ সমাবেশের প্রধান বক্তা সিপিআই(এম) পলিটব্যুরো সদস্য মানিক সরকার৷ সমাবেশের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ডিওয়াইএফআই রাজ্য সম্পাদক অমল ভৌমিক, টিওয়াইএফ সাধারণ সম্পাদক অমলেন্দু দেববর্মা ও সভাপতি রাজেন্দ্র রিয়াং, জিএমসি নেতৃত্ব রাধাচরণ দেববর্মা, বিশ্বজিৎ দত্ত প্রমুখ৷ ডিওয়াইএফআই সর্বভারতীয় সভাপতি তথা সাংসদ এমবি রাজেশ উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও বিমান বিভ্রাটে তিনি আগরতলা এসে পৌঁছুতে পারেননি বলে জানান ডিওয়াইএফআই রাজ্য সম্পাদক অমল ভৌমিক৷ এদিনকার সমাবেশে প্রচুর লোকসমাগম হয়৷ খোয়াই সরকারী দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ের মাঠে তিল ধরার জায়গা ছিল না৷ উপজাতিদের চিরাচরিত ধাচে গড়ে তোলা সুসজ্জিত মঞ্চে একে একে ভাষন রাখেন জিএমপি, টিওয়াইএফ নেতৃত্বরা৷ এদিকে ভাষন রাখতে গিয়ে জিএমপি নেতৃত্ব রাধারচণ দেববর্মা বলেন, আড়াই বছর হতে চলছে বিজেপি সরকারের৷ কিন্তু নির্বাচনী সব প্রতিশ্রুতিও পালন করেনি৷ বরং মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে মোদী সরকার৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *