নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ৪ জানুয়ারি৷৷ পশ্চিমবঙ্গে চিটফান্ড ইস্যুতে দলীয় সাংসদদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রদেশ তৃণমূল বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মণ দাবি করেন সেখানে সিবিআই এবং ইডি হানা দিয়েছে, তাহলে একই ইস্যুতে এরাজ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ বুধবার সাংবাদিক সম্মেলনে সুদীপবাবু অভিযোগ তুলে বলেন, বিজেপির সাথে সিপিএম’র গোপন সমঝোতা রয়েছে, তাই এরাজ্যে সিবিআই এবং ইডি হানা দিচ্ছে না৷ এই অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় সিপিএম রাজ্য সম্পাদক বিজন ধর কটাক্ষ করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের নেতৃবৃন্দরা চিটফান্ডকান্ডে জড়িত নেই সেই কথা একবারও জোর গলায় বলেননি সুদীপবাবু৷ বিজনবাবুর দাবি, রাজ্যে চিটফান্ড সংক্রান্ত বিষয়ে উচ্চ আদালতের তত্ত্বাবধানে সিট গঠিত হয়েছে৷ যার তদন্ত চলছে৷ ফলে, সিট’র তদন্তের ভিত্তিতে উচ্চ আদালত সিবিআই প্রয়োজন হলে সেই নির্দেশ নিশ্চয়ই দেবে৷ এদিকে, সিপিএম’র সাথে গোপন সমঝোতার প্রসঙ্গে বিজেপি প্রদেশ সভাপতি বিপ্লব দেব কটাক্ষ করে বলেন, নোট বাতিল ইস্যুতে তৃণমূল নেত্রী সিপিএমকেও আন্দোলনে সামিল হতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন৷ এখন সেই দলের প্রদেশ নেতৃত্বদের বিজেপির সাথে সিপিএম’র গোপন সমঝোতা রয়েছে দাবি রীতিমত হাস্যকর৷ তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের দুর্ভাগ্য কয়েকজন অপরিপক্ক নেতৃত্বের কারণে ত্রিপুরায় জনগণের দুর্দশা মিটছে না৷ এক্ষেত্রে রাজ্যেও চিটফান্ড ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ির লড়াই চরমে উঠেছে বলেই মনে করা হচ্ছে৷
বুধবার সাংবাদিক সম্মেলনে তৃণমূল বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মণ দাবি করেন, রাজ্যে বাম আমলেই চিটফান্ডের ব্যবসা শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে৷ এরজন্য তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে দায়ী করেছেন৷ সুদীপবাবু বলেন, বিরোধীরা চিটফান্ডের বিরুদ্ধে বহুবার আওয়াজ তুললেও রাজ্য সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি৷ বরং তাদের পালিয়ে যেতে সুযোগ করে দিয়েছে৷ চিটফান্ড সংক্রান্ত বিল বিধানসভাতে বিরোধীদের চাপেই এনেছে রাজ্য সরকার৷ কিন্তু এই বিলের সুফল আমানতকারীরা পাননি৷ এমনকি চিটফান্ড কান্ডে সিবিআই তদন্তও রাজ্য সরকারের কারণেই আটকে গেছে৷ সুদীপবাবুর দাবি, চিটফান্ড সংস্থাগুলির অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ কম দেখানোতেই সিবিআই সমস্ত মামলা নিতে চায়নি৷ রোজভ্যালির বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্ত খারিজ হয়ে যাওয়ার পেছনেও এই কারণই দায়ী বলে উল্লেখ করেছেন সুদীপবাবু৷ তাঁর আরো দাবি, সিবিআইকে রোজভ্যালি ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, আসাম এবং ত্রিপুরায় তদন্ত করার সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ রয়েছে৷ অথচ পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশাতে সিবিআই এবং ইডি রোজভ্যালির দপ্তরে হানা এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করলেও ত্রিপুরার দিকে নজর দিচ্ছে না৷ এই অভিযোগ তুলে সুদীপবাবুর বক্তব্য, বিজেপি’র সাথে সিপিএম’র গোপন বোঝাপড়া রয়েছে, তাই সিবিআই এবং ইডি এরাজ্যের দিকে এখনো নজর দেয়নি৷ বহু সম্পত্তি এরাজ্যে রোজভ্যালির থাকা সত্ত্বেও কোনকিছুই বাজেয়াপ্ত হয়নি৷ এদিন তিনি বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানান, দেরি না করে শীঘ্রই যেন সিবিআই এবং ইডি এরাজ্যেও হানা দেয়৷
সুদীপ রায় বর্মণের অভিযোগের ভিত্তিতে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক বিজন ধর বলেন, দলের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন৷ বিজেপি’র সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রশ্ণই উঠে না৷ বরং পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকেই বিজেপি’র সাথে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে আমরা দেখেছি৷ এদিন তিনি বলেন, রাজ্যে চিটফান্ড ইস্যুতে উচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করেছে৷ ফলে, নতুন করে রাজ্য সরকারের পক্ষে সিবিআই দাবি জানানো সম্ভব নয়৷ উচ্চ আদালতের তত্ত্বাবধানে এসআইটি (সিট) গঠিত হয়েছে৷ সিট চিটফান্ড ইস্যুতে সমস্ত মামলার তদন্ত করছে৷ যতদূর জানা গেছে, বেশ কয়েকটি মামলায় ইতিমধ্যে সিট চার্জশিট জমা দিয়েছে৷ ফলে, আগামীদিনে উচ্চ আদালত মনে করলে নিশ্চয়ই চিটফান্ড ইস্যুতে সিবিআই তদন্ত দেবে৷ এদিন তিনি কটাক্ষের সুরে বলেন, সাংবাদিক সম্মেলনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক সুদীপবাবু একবারও জোর গলায় বলেননি পশ্চিমবঙ্গে দলীয় নেতৃবৃন্দরা যারা চিটফান্ড ইস্যুতে গ্রেপ্তার হয়েছেন তারা জড়িত নন৷
এদিকে, বিজেপি প্রদেশ সভাপতি বিপ্লব দেব বলেন, রাজ্যে তৃণমূলের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে৷ জনভিত্তি তাঁরা হারিয়েছেন, তাই এখন সাংবাদিক সম্মেলন করে আবোল-তাবোল বকছেন৷ বিপ্লববাবু কটাক্ষ করে বলেন, তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জিই নোট বাতিল ইস্যুতে সিপিএমকেই কাছে পেতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন৷ এখন রাজ্যে তাঁর দলের বিধায়ক সিপিএম’র সাথে বিজেপির গোপন সমঝোতা রয়েছে বলে মানুষকে বোঝাতে চাইছেন৷ বিপ্লববাবুর দাবি, প্রদেশ তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্যে রাজ্যের জনগণ বিজেপিকে ভুলভাববেন এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই৷ বিপ্লববাবু মনে করেন, রাজ্যবাসী বুঝে গেছেন ত্রিপুরার অপরিপক্ক বিরোধী নেতৃত্বদের কারণেই এতদিন ধরে তাঁদের দুর্দশা মিটছে না৷ পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, সিবিআইকে প্রভাবিত করার মানসিকতা বিজেপির নেই৷ ইউপিএ আমলে সিবিআইকে প্রভাবিত করা হত৷ তাই রাজ্যে সিবিআই যখন মনে করবে তদন্ত করা প্রয়োজন তখন তারা নিশ্চয়ই উদ্যোগ নেবেন৷
রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম এবং বিজেপি যেভাবে চিটফান্ড ইস্যুতে একে অপরের বিরুদ্ধে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু করেছে তাতে পশ্চিমবঙ্গের ধাঁচেই ত্রিপুরাতেও রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে৷ বুধবার সন্ধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস রাজধানী আগরতলা সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে চিটফান্ড ইস্যুতে বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত করেছে৷ তৃণমূল বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মণ জানিয়েছেন, এধরনের কর্মসূচী রাজ্যে লাগাতর জারি থাকবে৷
2017-01-05