নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২০ এপ্রিল৷৷ প্রদেশ কংগ্রেসে বিদ্রোহের ঝাঁঝ আরো বাড়ল৷ দল বিরোধী অবস্থানের জের শোকজ নোটিশের জবাবে প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা সুদীপ রায় বর্মণ রাজ্যে দীর্ঘ সময়ের জন্য সিপিএম ক্ষমতায় থাকার পেছনে কংগ্রেস হাইকমান্ডের পরোক্ষ মদত রয়েছে বলে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন৷ দলের পূর্বোত্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ভি নারায়ণ স্বামীকে বুধবার স্পষ্টীকরণ দিয়ে পাঠানো চিঠিতে শ্রী বর্মণ গত ১৯৯৮, ২০০৩, ২০০৮ এবং ২০১৩ এই চারটি বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএমের জয়ের পেছনে কংগ্রেস হাইকমান্ডের পরোক্ষ মদত রয়েছে বলে উষ্মা প্রকাশ করেছেন৷ পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস নেতৃত্বদের ঐকান্তিক ইচ্ছায় দলের হাইকমান্ড বামেদের সাথে সমঝোতায় সায় দিয়ে ত্রিপুরা সহ জাতীয় স্তরে যে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছেছে তাতে রাজ্যে কংগ্রেস শিবির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন৷ দলবিরোধী অবস্থানের জের শোকজ নোটিশের স্পষ্টীকরণ দিতে গিয়ে প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা সুদীপ রায় বর্মণ হাইকমান্ডের বিরুদ্ধে যেভাবে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন তাতে আগামীদিনে রাজ্যে কংগ্রেস শিবিরে বিদ্রোহ আরো ঝাঁঝালো হয়ে উঠতে পারে বলে অনুমান করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল৷ শ্রী বর্মণ হাইকমান্ডকে বামপ্রীতি নিয়ে যেভাবে তোপ দেগেছেন তা কিভাবে গ্রহণ করবেন দলের শীর্ষ নেতৃত্বরা এনিয়েও নানা আলোচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে৷
এদিন, শোকজ নোটিশের জবাবে প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা সুদীপ রায় বর্মণ গত বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের সিপিএম নেতৃত্বদের কূটচালে কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতারা ত্রিপুরায় প্রচারে আসেননি বলে অভিযোগ করেছেন৷ কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি চিদাম্বরম নামকাওয়াস্তে রাজ্যে প্রচারে এসে আদতে সিপিএমকেই মাইলেজ পাইয়ে দিয়েছেন বলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন৷
ভি নারায়ণ স্বামীকে শোকজ নোটিশের স্পষ্টীকরণে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলে সন্ত্রাস, অপশাসন এবং দলীয় কর্মীদের হত্যার বিষয়গুলি নানাভাবে তুলে ধরেছেন শ্রী বর্মণ৷ এমনকি রাজ্যে দীর্ঘ বামফ্রন্টের শাসনে বহু নেতা কর্মী খুন এবং নানাভাবে সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার বিষয়গুলিও তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন৷
কিন্তু তিনি স্পষ্টীকরণে ত্রিপুরা কংগ্রেসের প্রতি দলীয় হাইকমান্ডের বিমাতৃসুলভ আচরণের বিষয়টিকেই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন৷ ১৯৯৩ সালে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমহা রাওকে সিপিএম ব্ল্যাকমেইল করে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন লাগু করিয়েছে৷ তাতে শাসকদলীয় ক্যাডাররা এবং এটিটিএফ সন্ত্রাসবাদীরা নির্বাচনে সিপিএমের পক্ষে রিগিং করেছে৷ আর এভাবেই নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে সেদিন সিপিএম জয়ী হয়েছিল শ্রীবর্মণ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন৷ হাইকমান্ডের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে শ্রী বর্মণের কটাক্ষ গত চারটি বিধানসভা নির্বাচনে দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বরা প্রদেশ কংগ্রেসকে কোন গুরুত্ব দেয়নি৷ স্বাভাবিকভাবে তাঁরা সিপিএমকে জয়ী হতে পরোক্ষভাবে মদত করেছেন৷ তিনি দাবি করে বলেন, গত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল ছিল৷ কিন্তু রাজ্যে সিপিএম নেতৃত্বরা নির্বাচনের প্রাক্মুহূর্তে প্রচার করেছেন তাঁদের দলের কেন্দ্রীয় নেতা সীতারাম ইয়েচুরির অনুরোধে কংগ্রেসের কোন হেভিওয়েট নেতা রাজ্যে নির্বাচনী জনসভা করতে আসবেন না৷ মুখ রক্ষার খাতিরে কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী কয়েকটি জনসভায় অংশ নিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু দলীয় কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার মতো ঝাঁঝালো ভাষণ রাখেননি৷ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেছেন, অনেক চেষ্টা করে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি চিদাম্বরমকে কমলপুর শহরে একটি জনসভায় উপস্থিত করা সম্ভব হয়েছিল৷ কিন্তু কংগ্রেসের শীর্ষ স্তরের নেতৃত্বদের বৈষম্যের কারণে রাজ্যে দল নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷
শ্রী নারায়ণস্বামীকে পাঠানো চিঠিতে তিনি রাজ্যে তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন৷ তাঁর দাবি, অমরপুর উপনির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তাঁর মন্তব্যকে ঘিরে প্রদেশ কংগ্রেসের একাংশ হাইকমান্ডকে ভুল বোঝাচ্ছেন৷ পাশাপাশি তিনি অমরপুর উপনির্বাচনে পরাজয়ের কারণ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সাথে বামেদের সাথে সমঝোতা অনেকাংশে দায়ী বলে তিনি আবারও দাবি করেছেন৷ এমনকি অমরপুর উপনির্বাচনে পরাজয়কে ঘিরে তাঁর মন্তব্য দলবিরোধী নয় বলেও তিনি দাবি করেছেন৷ পশ্চিমবঙ্গে বামেদের সাথে যে কোন অর্থেই সমঝোতা ত্রিপুরা এবং কেরেলা এমনকি গোটা দেশে দলকে চরম সর্বনাশের মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে তিনি এই যুক্তিতে অনঢ় রয়েছেন৷ শুধু তাই নয়, তিনি শোকজ নোটিশের খন্ডন করে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে তার মতামত কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে চিঠিতে জানিয়েছেন৷ এমনকি বার দুয়েক তাঁকে ফোনে পশ্চিমবঙ্গে বামেদের সাথে যে কোন অর্থে সমঝোতায় আপত্তি করেছেন সেই বিষয়টি নারায়ণস্বামীকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি৷
এদিন, শোকজ নোটিশের স্পষ্টীকরণ দিতে গিয়ে প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা সুদীপ রায় বর্মণ যেভাবে আরো বিস্ফোরক হয়ে উঠেছেন তাতে আগামীদিনে রাজ্য রাজনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল৷ শুধু তাই নয়, হাইকমান্ডকে জড়িয়ে সমস্ত বিস্ফোরক মন্তব্যের জের আগামীদিনে দল শ্রী বর্মণের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর অবস্থান নেবে সে বিষয়েও প্রশ্ণ উঠতে শুরু করেছে৷ কারণ, তিনি দলে থেকেই দলের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সুর চড়িয়েছেন৷ ফলে, এখন কংগ্রেস হাইকমান্ড ঘর সামলাবেন নাকি বামপ্রীতি উজাড় করে দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন পটপরিবর্তন করতে চলেছেন এনিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে৷
2016-04-21