পৃথক রাজ্যের দাবী অসাংবিধানিক নয় ঃ কংগ্রেস, রাজ্যভাগের দাবী প্রসঙ্গে বিধানসভায় জোর তর্কযুদ্ধ

CM Manikনিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ৮ জানুয়ারি৷৷ পৃথক রাজ্যের দাবি নিয়ে আজ বিধানসভায় সরকার পক্ষ ও বিরোধীদের মধ্যে জোর বাক্যুদ্ধ হয়েছে৷ এই দাবির বিরোধীতা করে আনা বেসরকারি প্রস্তাবের কৌশলী বিরোধীতা করে কংগ্রেস৷ এডিসি এলাকায় অনুন্নয়নকেই পৃথক রাজ্যের দাবি ওঠার পিছনে কারণ বলে উল্লেখ করে৷
এদিন, পৃথক রাজ্যের দাবির বিরোধীতা করে বিধানসভায় বেসরকারি প্রস্তাব আনেন ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্য বিধায়ক সুধন দাস৷ এদিকে, পৃথক রাজ্যের দাবিকে বিরোধিতা করলেও তা অসাংবিধানিক নয় বলে মন্তব্য করেন বিরোধী দলনেতা সুদীপ রায় বর্মণ৷ তিনি এই প্রস্তাবের সংশোধনী আনেন৷ বিরোধী দল নেতার এবিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, সামনে ভিলেজ কমিটি নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে রাজনীতি করার উদ্দেশ্যে এই প্রস্তাব আনা হয়েছে৷ তবে ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যরা সহ মুখ্যমন্ত্রী এই প্রস্তাবের সমর্থনে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রস্তাবটি যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক এবং যুক্তিসঙ্গত৷ অবশ্য বিরোধী বেঞ্চের সদস্যরা তাতে স্বাভাবিকভাবেই সহমত পোষণ করেন নি৷ তাদের বক্তব্য, উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় উন্নয়ন আজও অধরা৷ আর এই কারণে একাংশ উপজাতি পৃথক রাজ্যের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন৷ এই দাবি সমর্থন না করা গেলেও তা অসাংবিধানিক নয় বলেই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বিরোধী বেঞ্চের সদস্যরা৷
ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্য বিধায়ক সুধন দাস যে বেসরকারি প্রস্তাবটি আনেন সেটি হল, ‘ত্রিপুরাকে ভাগ করে আরো একটি নতুন রাজ্য গঠনের দাবি উত্থাপন করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল রাজ্যের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করে ত্রিপুরার অগ্রগতি ও সমৃদ্ধকে বিঘ্নিত করতে চাইছে৷ ত্রিপুরা বিধানসভায় রাজ্যকে ভাগ করার এই সংকীর্ণ চিন্তা প্রসূত দাবির সর্বৈব বিরোধিতা করছে এবং রাজ্যের জনগণের একতা সংহতি ও সম্প্রীতিকে আরো সুদৃঢ় করার জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানাচ্ছে৷’ বিরোধী দলনেতা সুদীপ রায় বর্মণ প্রস্তাবটি সংশোধনী এনে বলেন, প্রস্তাবটিতে এডিসিকে অধিক ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টিও যুক্ত করা উচিত৷ এদিন তিনি, প্রস্তাবটির সংশোধনীর স্বপক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় উন্নয়ন হয়নি বলে রাজ্য সরকারের সমালোচনায় মুখর হন৷ তিনি স্পষ্ট জানান, যে ধরনের পরিকাঠামো শহরাঞ্চলে দেখা যায় তার ছিটেফোঁটাও উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় গড়ে ওঠেনি৷ পরিশ্রুত পানীয় জল থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবকিছুতেই উপজাতি এলাকায় ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ এবিষয়ে বিরোধী দলনেতার ব্যাখ্যা, উপজাতি অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দারা পার্শ্ববর্তী রাজ্যে গেলে সেখানে যে সুযোগসুবিধা লক্ষ্য করেন তার সাথে এই রাজ্যের উপজাতি এলাকাগুলির বিরাট পার্থক্য রয়েছে সেটা উপলব্ধি করেন৷ এরই ফলশ্রুতিতে নির্বাচনে শাসকদলের দশ শতাংশ ভোট কমেছে বলে তিনি দাবি করেন৷ এদিন তিনি অভিযোগ করে বলেন, এডিসিকে কার্যত দপ্তরে পরিণত করে রাখা হয়েছে৷ রাজ্য সরকার চাইছে না এডিসির হাতে সরাসরি অর্থ প্রদান করা হোক৷ তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হল, এডিসি এলাকার উন্নয়ন দাবি করে তাদের তরফে কেন্দ্রের কাছে কখনই সরাসরি অর্থ প্রদানে তদ্বির করতে দেখা যায়না৷ এদিন, বিরোধী বেঞ্চের সদস্য বিধায়ক রতন লাল নাথও পৃথক রাজ্যের দাবি অসাংবিধানিক নয় বলে মন্তব্য করেন৷
তবে, প্রস্তাবটির সমর্থনে এবং বিরোধী দলনেতার সংশোধনীর বিরোধিতায় মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার দাবি করে বলেন, ত্রিপুরাকে ভাগ করে নতুন রাজ্য গঠনের মধ্য দিয়ে উপজাতিদের স্বার্থ রক্ষা হবে না৷ সবকিছু ধবংস করে দিতেই বিভেদকামী শক্তি প্ররোচনা দিচ্ছে৷ পাশাপাশি তিনি বিরোধী বেঞ্চের সদস্যদের কটাক্ষ করে বলেন, মূল প্রস্তাবের সাথে যে সংশোধনীটি আনা হয়েছে তা বিষয়টির মূল ভাবনা থেকে সরিয়ে দিতেই করা হয়েছে৷ এবিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, অতীতেও এই রাজ্যে স্বাধীন ত্রিপুরা শ্লোগান উঠেছে৷ বিদেশী বিতারণের বিষয় পর্যন্তও উঠেছে৷ আমরা রাজনৈতিক এবং আদর্শগতভাবেই তার মোকাবিলা করেছি৷ এদিন মুখ্যমন্ত্রী উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, রাজ্যের মধ্যকার প্রতিক্রিয়া শক্তি বাইরের প্রতিক্রিয়া শক্তির মদতে এমনটা করছে৷ উন্নয়নের প্রশ্ণে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে আমরা সবসময়ই কথা বলতে আগ্রহী৷ তাদের সাথে কথা বলে সংবিধানের মধ্যে থেকে যদি কিছু করা যায় তাতে কোন আপত্তি নেই এবং আমরা সর্বদাই প্রস্তুত৷ কিন্তু এক্ষেত্রে যখনই তা রাজ্যের এক্তিয়ার বর্হিভূত দেখা দেয় তখনই তা কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণও করা হয়েছে৷ উপজাতিদের উন্নয়ন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর জোরালো সওয়াল তেরশ বছর ধরে ১৮৪ জন রাজা ত্রিপুরায় রাজত্ব করে গেলেও তাদের উপকারে কোন কাজ হয়নি৷ তিনি দাবি করে বলেন, রাজ্যের উপজাতি অংশের মানুষের স্বার্থে কাজ করছে সরকার৷ রাজন্য শাসনে প্রত্যেকেই উপজাতি রাজা ছিলেন৷ তা সত্ত্বেও শিক্ষার সম্প্রসারণে জনশিক্ষা আন্দোলন হয়েছে৷ দশরথ দেব, সুধন্য দেববর্মাদের নির্যাতিত হতে হয়েছে৷ তিনি কটাক্ষের সুরে বলেন, রাজন্য আমল ও কংগ্রেস শাসিত ত্রিপুরায় কক্বরক ভাষা স্বীকৃতিও দেওয়া হয়নি৷ ভাষার দাবি জানিয়ে উপজাতি অংশের মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন৷ শহীদ হয়েছেন ধনঞ্জয় ত্রিপুরা৷ ১৯৭৮ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পরই উপজাতি অংশের মানুষের আর্থ সামাজিক মানোন্নয়নে প্রথমে সপ্তম তপশিল ও পরে ষষ্ঠ তপশিল মোতাবেক জেলা পরিষদ গঠন হয়েছে বলে দাবি মুখ্যমন্ত্রীর৷
এদিন, এই প্রস্তাবের সমর্থনে এবং বিরোধি দলনেতার আনা সংশোধনীকে বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন উপজাতি কল্যাণ মন্ত্রী অঘোর দেববর্মা, গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী নরেশ জমাতিয়া, বিধায়ক সুধন দাস ও বিধায়ক প্রণব দেববর্মা৷ প্রত্যেকেই ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদকে অধিক ক্ষমতা প্রদানের বিষয়টি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত বলে দাবি করেন৷ পাশাপাশি রাজ্যের কিছু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক দল এডিসি এলাকাকে নিয়ে আলাদা রাজ্যের দাবিতে বর্তমান উদ্ভুত পরিস্থিতি শান্তি ও সম্প্রতির বাতাবরণ নষ্ট করার এক ভিন্ন চক্রান্ত বলে সমালোচনায় মুখর হন৷ এরই সাথে এরাজ্যে জাতি উপজাতির মধ্যে উন্নয়নের প্রশ্ণে কোন ভেদাভেদ নেই বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন৷ পরে বিধানসভায় এই বেসরকারি প্রস্তাবটি ধবনি ভোটে গৃহীত হয় এবং বিরোধী দলের আনা সংশোধনীটি ধবনি ভোটে বাতিল হয়৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *