ত্রিপুরা সহ ১১ রাজ্যে ভূকম্পন, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২

earthquakeনিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ৪ জানুয়ারি৷৷ সোমবার ভোর রাতের ভূমিকম্পে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ত্রিপুরা সহ গোটা উত্তরপূর্বাঞ্চলে৷ দেশের এগারটি রাজ্যে ভূকম্পন আঘাত এনেছে৷ সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি মণিপুরে৷ মণিপুরের রাজধানী শহর ইম্ফলে বহুতল বাড়ি ধবসে পড়েছে৷ এছাড়াও আরো বেশ কিছু বাড়িঘর বিধবস্ত হওয়ায় কম করেও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ৷ বাংলাদেশেও তিনজনের প্রাণহানির খবর মিলেছে৷ পশ্চিমবঙ্গেও আঘাত এনেছে ভূমিকম্প৷
রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ভূকম্পে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পালাতে গিয়ে তিনজন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গিয়েছে৷ কয়েকটি স্থানে মাটির দেওয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে৷ তবে বড় মাপের কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই৷ ধলাই জেলার কমলপুর মহকুমার দারাং গ্রামের অনাদি সরকার রায়(৪৭) আহত হয়েছেন৷ তাছাড়া হারের খোলা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক চিনু দাস আহত হয়েছেন৷ নাগবংশি এলাকার গান্ধী সরকারের মাটির দেওয়াল ফেটে গিয়েছে৷ খোয়াইয়ে জনৈক যশপাল সিং আহত হয়েছেন৷ তাছাড়া আগরতলায় বনমালিপুর এলাকায় এক যুবতীও আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গিয়েছে৷ এদিকে, ভোরে ভূকম্পনে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়েন মানুষজন৷ রাস্তায় কিংবা খোলা জায়গায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান৷ মহিলারা উলুধবনি ও শাখ বাজিয়ে তাদের চিরাচরিত প্রথা বজায় রেখেছেন৷ সব মিলিয়ে ভোর রাতের পর অনেকেই বিনিদ্র রাত্রীযাপন করেছেন আতঙ্কে৷
ভোররাত ৪৩২ নাগাদ ভূকম্পন অনুভূত হয়৷ রিখটার স্কেলে ভূকম্পনের অনুপাত ছিল ৬৭৷ সোমবার সকাল নয়টা নাগাদ মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়৷ ভূকম্পনের উৎপত্তিস্থল ভারত-মায়ানমার সীমান্ত৷ মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে মাটির ১৭ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল৷ ঘড়িতে সময় তখন ভোররাত ৪৩২ মিনিট৷ মানুষজন শীতঘুমে আচ্ছন্ন৷ হঠাৎই ভূমিকম্প অনুভূত হয়৷ শীতঘুম ভেঙ্গে যায় প্রত্যেকেরই৷ শুরু হয় উলুধবনি, শঙ্খঘন্টা বাজানো৷ তাতে শিহরণ জাগে সর্বত্র৷ মানুষজন নিরাপদ স্থানের জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে শুরু করেন৷ তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বের হতে গিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন জখম হওয়ার খবর মিলেছে৷ কয়েকটি স্থানে কিছু ঘরবাড়ি অল্প বিস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও রয়েছে৷ তবে ত্রিপুরায় ভূমিকম্পে প্রাণহানির কোন খবর নেই৷ উল্লেখ্য, উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ভূমিকম্পের বিপজ্জনক জোনে অবস্থান করছে৷ আমাদের রাজ্য ত্রিপুরাও ভূমিকম্পের ৫নম্বর জোনে অবস্থান করছে৷ ফলে, যো কোন সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে৷
সোমবার ভোর ৪৩৭ মিনিট নাগাদ প্রবল ভূমিকম্প নাড়িয়ে দিয়েছে সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চলকে৷ এর প্রায় পাঁচ ঘন্টা পর ফের মণিপুরকে কাঁপিয়ে দেয়৷ এতে শিশু ও বৃদ্ধ সহ মণিপুরের দশ এবং আসামের বারো জন নিহত হয়েছে৷ মণিপুরে সরকারীভাবে আহতের সংখ্যা একশোর বেশি এবং আসামে প্রায় ত্রিশজন বলে জানা গিয়েছে৷ আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে৷ ইম্ফল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে বারত-মায়ানমার সীমান্তবর্তি তামেংলং এলাকা ছিল এর উৎসস্থল৷
আজকের ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে৷ ঘটনার প্রায় ঘন্টাখানেকের মধ্যে দুর্গতদের সাহায্যে দু ভাগে বিভক্ত হয়ে এনডিআরএফ এর ৯০ জনের একটি দল গুয়াহাটি থকে রওয়ানা হয়ে ইম্ফল এসেছে৷ ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে পরিস্থিতির খোঁজ নিতে ইম্ফল এসে পৌঁছলেন কেন্দ্রীয় ডোনার মন্ত্রী ডঃ জীতেন্দ্র সিং৷ এদিকে সকালেই গুয়হাটিতে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈর সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতির খোঁজ নিয়েছেন মোদি৷ গুয়াহাটির কার্যক্রম শেষ করে শীঘ্র তাঁকে ইম্ফলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে রাজনাথকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে৷ এদিকে ভূকম্প বিধবস্ত আসাম ও মণিপুরকে সর্বোতভাবে সাহায্যের আশ্বাস দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী৷ গুয়াহাটিতে প্রাণের তাগিদে দৌঁড়তে গিয়ে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন ষাটোর্দ্ধ জনৈক নিরঞ্জন দাস এবং মালিগাঁওয়ের রাজু বরা৷
উল্লেখ্য মণিপুরে বহু অট্টালিকা খসে পড়ার পাশাপাশি কয়েকটি অঞ্চলের রাজপথে বিশাল বিশাল ফটাল ধরেছে৷ এখানে মৃত্যুর সংখ্যা দশে পৌঁছলেও এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে াাশঙ্কা৷ এক ইম্ফলেই ৮০ থেকে ৯০ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন৷ তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জনের অবস্থা সংকটজনক৷ মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওখরাম ইবোবি সিংহ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজ খবর নিয়েছেন৷ তিনি জরুরীকালীন পরিস্থিতিতে রাজ্যের ক্যাবিনেট বৈঠক ডেকেছেন৷
ভোররাতের শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল৷ শীতের ভোরে তখনও ঘুমিয়ে অধিকাংশ মানু৷ হঠাতই কেঁপে উঠল বাড়ি৷ ভূমিকম্পে হচ্ছে, বুঝতে পেরেই আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন অনেকে৷ ভূমিকম্পের উৎসস্থল মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে বলে আবহাওয়া জানিয়েছে৷ কম্পন অনুভূত হয়েছে মণিপুরে, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, পশ্চিমবঙ্গ, অসম, অরুণাচল প্রদেশ, বিহার, ওড়িশা এবং ঝাড়খন্ডেও৷ সোমবার ভোর ৪টে ৩৬ মিনিট নাগাদ মণিপুর সহ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে এই ভূমিকম্পে হয়৷ রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৬৭৷ বেশ কয়েক সেকেন্ড ধরে কম্পন স্থায়ী হয়৷ এ দিনের কম্পনের উৎসস্থল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৭ কিলোমিটার গভীরে বলে প্রাথামিক ভাবে জানা গিয়েছে৷ ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মণিপুরেই৷ সেখানে ভেঙে পড়েছে বেশ কয়েকটি বাড়ি৷ বাড়ি চাপা পড়ে মৃতুয হয়েছে অন্তত ৮ জনের৷ আহত শতাধিক ৷ ভূতত্ব বিভাগে জানিয়েছে, ভূমিকম্পের উৎসস্থল মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে তামেংলং জেলার নানি গ্রাম৷ সেখানে বহু বাড়ি ভেঙে পড়েছে৷ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ইম্ফলের বিখ্যাত মহিলা বাজার৷ সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ ৩৬ মাত্রার ভূমিকম্প পরবর্তী কম্পন ফের অনুভূত হয় মণিপুরে৷ এই ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত সহ প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার-বাংলাদেশেও৷ রাজধানী ঢাকা-সহ কম্পন অনুভূত হয়েছে প্রায় সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে৷ কম্পনের পরই প্রধানমন্ত্রী টুইট করে জানান, এই মুহুর্তে অসমে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং৷ তাঁকে পরিস্থিতির উপর নজর রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে৷ অসমের মুখ্যমন্ত্রী তরুন গগৈ এবং মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওকরাম ইবোবির সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে৷
ভূবিজ্ঞানীরা বলছেন, মণিপুরের এই অঞ্চলটি ভূমিকম্পে প্রবণ৷ এপ কলায় বামির্জ আর্ক আছে৷ আর আছে ভারতীয় প্লেট৷ একে আরাকান ইয়োমা সাবডাকশন জোন বলে৷ তার ফলে ১৯৩০ সাল থেকে সংগৃহীত তথ্যে দেখা যাচ্ছে এই অঞ্চলে বার বার ৬-৬৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে৷ তবে ভূবিজ্ঞানীরা এটা জানিয়েছেন, নেপাল ভূমিকম্পের সঙ্গে এই কম্পনের একটা ফারাক রয়েছে৷ যাদবপর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুগত হাজরা বলেছেন, নেপালের ক্ষেত্রে একটি প্লেট আরেকটি প্লেটের তলায় ঢুকে গিয়েছিল৷ এ ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে একটি প্লেট আরেকটি প্লেটের থেকে দূরে যাওয়াতেই এই ঘটনা৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *