রাজনীতিকদের এত ঔদ্ধত্য আসে কীভাবে

অশোক সেনগুপ্ত

আবার বিতর্কের মুখে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। এবার সরাসরি আক্রমণ হেনেছেন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। অশালীন, উদ্ধত উক্তি করেই ক্ষান্ত হননি। প্রবল বিতর্কের পরেও ‘বেশ করেছি বলেছি’ গোছের মনোভাব। সামাজিক মাধ্যম এ কারণে দু’দিন ধরে উত্তাল। কিন্তু মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আপত্তি জানিয়েছেন আমার জানা মাত্র তিন জন রাজনীতিক। বিজেপি-র, বাবুল সুপ্রিয় এবং অমিত মালব্য। আর নবীন বনমন্ত্রী রাজীব ব্যানার্জী, এই মুহূর্তে দলে যাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন, মহুয়া মৈত্রর ‘অসভ্যতার’ সমালোচনা করেছেন। এ ছাড়া তৃণমূল কংগ্রেসের দুই বরিষ্ঠ সদস্য কুণাল ঘোষ এবং বিধায়ক প্রবীর ঘোষাল। আদতে এঁরা দু’জনই প্রাক্তন সাংবাদিক, আমাদেরই পেশার। কিন্তু মঙ্গলবার তৃণমূল ভবনে প্রেস কনফারেন্সে প্রবীণ মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় কৌশলে প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে গিয়েছেন। তবে দিন শেষে মুখ্যমন্ত্রীর জবাব, প্রেসের সম্মান আছে-ওঁরা মানুষকে সাহায্য করে!

লেখার শুরুতে ’আবার বিতর্কের মুখে’ কথাটা লিখলাম কারণ এর আগে অন্তত তিনবার বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন মহুয়া। সেগুলোর প্রসঙ্গ এনে লেখার কলেবর বাড়ালাম না। এবারের ঘটনাটার উৎসটা কী? আসলে ভোট যত এগিয়ে আসছে নদিয়ায় তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তত প্রকট হচ্ছে। রবিবার গয়েশপুরে করিমপুর ২ ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী সম্মেলনে মেজাজ হারিয়ে সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। নদিয়া জেলা তৃণমূল সভানেত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে প্রতি মাসে জেলার বিভিন্ন বুথের কর্মীদের নিয়ে সম্মেলন করছেন তিনি। এমন একটি সম্মেলনে দলীয় কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন মহুয়া। আর সেখানেই আপত্তিকর ভঙ্গীতে সংবাদমাধ্যমকে কটূক্তি করেন। সহকর্মীদের বলেন, “দু পয়সার প্রেস, সরা ওদের; কে ডাকে ওদের”। সভা থেকে সাংবাদিকদের বার করে দেন। দলের আভ্যন্তরীণ বিষয় সংবাদমাধ্যম কেন ঢুকবে? দলীয় বৈঠকে সংবাদমাধ্যমকে ঢোকার অনুমতি কে দিয়েছেন, জানতে চান দলের নেতা-কর্মীদের কাছে। উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, “কে এই দু’পয়সার প্রেসকে ভেতরে ডাকে? কর্মী বৈঠক হচ্ছে। আর সবাই টিভিতে মুখ দেখাতে ব্যস্ত। আমি নির্দেশ দিচ্ছি, প্রেসকে সরান!” মহুয়ার সেই বক্তব্যই রেকর্ড করা হয়। যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তৃণমূল সাংসদকে কটাক্ষ করা শুরু করেন অনেকে।

প্রবল আলোড়ণের পর তাঁকে বয়কটের ঘোষণা করেছে একাধিক নামী চ্যানেল। মহুয়াকে প্রচারমাধ্যমের সর্বস্তরে বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে তাঁকে বয়কটের ঘোষণা করেছে ‘কলকাতা টিভি’ ও সিএন চ্যানেল। প্রতিবাদ জানিয়েছে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন। প্রতিবাদী সংগঠনের সংখ্যা বাড়ছে।

সোমবার দিনভর হইচইয়ের পর সন্ধ্যাতেই সামাজিক মাধ্যমে একটি পোষ্টের মাধ্যমে ব্যঙ্গ করে ক্ষমা চান মহুয়া। তাতে অনেকটা আগুনে ঘিয়ের কাজ করে। টুইটার বা হোয়াট্‌সঅ্যাপ ডিপি-তে; তিনি ‘ক্ষমা’ চাইলেও তাঁর মন্তব্য যে ‘সঠিক’; সে কথাও স্পষ্ট জানান তিনি। অর্থাৎ নিজের মন্তব্যে অনড় থাকেন।

তার পরেই, সোমবার রাতের পর সামাজিক মাধ্যম ছেয়ে যায়; “তুই দু পয়সার সাংসদ” ছবিতে। কলকাতা প্রেস ক্লাব সোমবারই মহুয়ার আচরণের প্রকাশ্য প্রতিবাদ জানায়। ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে মহুয়া সেই প্রতিবাদ নিয়ে র্রকাশ্যেই প্রশ্ন তোলেন।

মহুয়াকে একহাত নিয়েছেন টলিউড পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। ফেসবুকে একটি পোস্ট করে পরিচালকের মন্তব্য, “উপার্জনের ‘দু পয়সা’ তোলাবাজির দু কোটির থেকে অনেক দামি।” সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়িয়ে পরিচালকের এমন মন্তব্যে অনেকেই সমর্থন জানিয়েছেন।

বরিষ্ঠ সাংবাদিক দেবাশিস দাশগুপ্ত প্রশ্ন তুলেছেন, “মহুয়ার অসভ্যতা নিয়ে বুদ্ধিজীবীরা চুপ কেন? দুই পয়সার তৃণমূল সাংসদ মিডিয়াকে দু’পয়সার প্রেস বলছেন। কলকাতা প্রেস ক্লাব তার নিন্দা করায় আবার সাংবাদিকদের মান নেমে যাচ্ছে বলে জ্ঞান দিয়েছেন। এরপরও শাসক দলের অনুপ্রাণিত বুদ্ধিজীবীরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছেন। আর কৌশিক সেন, অপর্ণা সেন, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তরাই বা চুপ কেন?“

আর এক বরিষ্ঠ সাংবাদিক অরূপ কালী ‘মহুয়া এবং সোজাসাপটা’ শিরোনামে লিখেছেন, “কথায় অহংকার। কথায় অন্যকে অবজ্ঞা। কথায় অন্যকে অপমান। না তারপরেও অনুতপ্ত নন। নিজের কু কথায় অনড় মহুয়া মৈত্র। প্রশ্নটা ঠিক এখানেই। সাংবাদিকদের অপমান কী প্রথম তৃণমূল এর এই সাংসদ করলেন? একেবারেই নয়। বিগত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের অপমান সহ্য করা গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। নেতা, নেত্রীদের প্রশ্ন অপছন্দ হলে, অবলীলায় অন্য “দলের ” বলে দেগে দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিককে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় লাল চোখ দেখানো হয়েছে। রিপোর্ট অপছন্দ হলে সোজা সংবাদমাধমের মালিকের কাছে ফোন গিয়েছে। সঙ্গে দাবি, অমুক রিপোর্টারকে আর পাঠানো চলবে না। চলছে, এভাবে চলছে। মহুয়ার দুই পয়সার সাংবাদিক মন্তব্য সেই মানসিকতার প্রতিফলন। দমিয়ে রাখার চেষ্টা। সংসদে বক্তব্যের পরে তৃণমূলের এই সংবাদ ছুটে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন চ্যানেলে। জানিনা দাম মেপে সেখানে গিয়েছিলেন কিনা। তবে কেন্দ্র বিরোধিতার মুখ হিসেবে যখন তুলে ধরা হচ্ছিল, উপভোগ করছিলেন। বিরক্তি ছিল না, হাসি মুখে উত্তর দিচ্ছিলেন। নিজেকে কীভাবে প্রচারে রাখতে হয় ভালো জানেন সাংসদ। আদর্শের বিষয়টি গৌণ। তাই দলবদল অনায়াসে করতে পারেন। উদার মানসিকতা, তৃণমূলে থেকে রাজ্য সভাপতিকে ফোন করে নিজের দলের বিধায়ককে বিজেপিতে নেওয়ার অনুরোধ করতে পারেন।

মহুয়া মৈত্রর বক্তব্যের সমালোচনা হচ্ছে। হওয়া উচিত. কিন্তু উনি এতো বড় নেত্রী নন, অনবরত আলোচনা চলতেই থাকবে. রাজ্য রাজনীতির বইতে একটি লাইন ওনার জন্য বরাদ্দ থাকবে না।
প্রতিবাদটা জরুরি। আশা করি মহুয়ার বক্তব্যের প্রতিবাদেই বিষয়টি থেমে থাকবে না. প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিবাদ হবে। প্রতিবাদের আমরা = ওরা নয়।
কারোর কথায় নিজের দাম ধার্য্য করতে পারলাম না।”

অসংখ্য প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নজর কেড়েছে জি এবং আনন্দবাজার প্রিকার প্রাক্তন সাংবাদিক, দিল্লি বিশ্ববিথ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত মনুজেন্দ্র কুন্ডুর লেখা। তিনি লিখেছেন, “মাননীয়া সাংসদ, সবাই আপনাকে ধিক্কার-টিক্কার দিচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি মনেই করি না, আপনি কোনো দোষ করেছেন। ঠিকই করেছেন। কারণ, আপনি তো দেখেছেন, বুঝেছেন এবং বিশ্বাস করেছেন সেই অমোঘ নিদানগুলো: ‘আনন্দবাজার পড়বেন না, টেলিগ্রাফ পড়বেন না, গণশক্তি পড়বেন না। এবিপি আনন্দ দেখবেন না। ২৪ ঘণ্টা দেখবেন না।’ বেশি দিনের কথা তো নয় এগুলো। সবাই ভুলে গেলেও আপনি কিন্তু ভোলেননি। আপনি ভোলেননি যে কী ভাবে সরকারি গ্রন্থাগারগুলো থেকে দৈনিকগুলো অনেক দিন ধরে প্রত্যাহৃত হয়ে ছিল।

তখন আপনি কোথায়? কেই-বা জানত আপনার কথা! কিন্তু আপনি অদৃশ্য থেকেও শুনেছেন। মনে রেখেছেন। আপনার প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং সেই সব অমোঘ বাণীগুলো আত্তীকরণ এবং আত্মীকরণের শক্তি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আপনাকে সাধুবাদ জানানো ছাড়ানো আজ আমাদের আর কী-ই বা করণীয়, বলুন। ঠিকই বলেছেন। সাংবাদিকরা, শুধু সাংবাদিকরাই কেন, অধ্যাপক অম্বিকেশ, ছাত্রী তানিয়া, চাষি শিলাদিত্য, ‘রাত-পসারিণী’ সুজেট–এঁরা, এঁদের মতো সব্বাই দু’পয়সারই।

শুধু বলছিলাম, আজ যাঁদের জন্য আপনারা ভারত বনধ সমর্থন করছেন, তাঁরা কি দু’পয়সার বেশি? আসলে তাঁরা আপনাদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে কি না। তাই ভাবলাম, হয়তো তাঁদের দাম দু’পয়সার চেয়ে কিঞ্চিত্ বেশি। আজকাল সব গুলিয়ে যায়। তাই ঠাহর করতে হিমশিম খেয়ে যাই কি না। কিছু মনে করবেন না। আপনি ঠিকই করেছেন। ঠিকই করে আসছেন আপনারা। ‘পরিবর্তনের’ ১১ বছর ধরে। আপনারা এগিয়ে যান। আমরা আপনাদের পিছনেই আছি। চোখ বন্ধ করে।“

সাংবাদিক দেবময় ঘোষ লিখেছেন, “সব বিষয়ে মন্তব্য করতে পছন্দ করি না। এক তৃণমূল সাংসদের অসভ্যতার পরেও তাই একটি শব্দও খরচ করিনি। শুধু অপেক্ষা করে আছি ওই সাংসদের প্রতি তৃণমূলের অবস্থান জানতে …।” সাংবাদিক সুমিত চৌধুরী লিখেছেন, “আমি যতদূর জানি এই মহুয়া রানাঘাটের পাল চৌধুরী জমিদার বাড়ির বংশধর। সামন্ততান্ত্রিক অবশেষের হ্যাংওভার কাটেনি।

বাম আমলে অনেক দিন নামী দৈনিকের সাংবাদিক হিসাবে মহাকরণ বিট করেছি। সাংবাদিকদের সম্পর্কে অপ্রীতিকর মন্তব্য অবশ্যই কেউ কেউ এক-আধ সময়ে করেছেন। কিন্তু সে সব গভীর রেখাপাতের মত হয়নি। সামগ্রিক বিতর্কে উঠে আসছে সাংবাদিকদের ভাল-মন্দের প্রসঙ্গ। সেগুলো অন্য প্রসঙ্গ। এই আলোচনার সঙ্গে একেবারেই সংপৃক্ত নয়।

তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় ছিলেন সকলেই। অবশেষে এ বিষয়ে রানিগঞ্জের সভায় মুখ খুললেন তিনি। প্রেসের সম্মান আছে-ওঁরা মানুষকে সাহায্য করে!’ মহুয়াকে ‘নীরব’ জবাব মমতার।