News Flash

  • Home
  • Uncategorized
  • ৭০তম বার্ষিকী উদযাপন উৎসব আসছে ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর, স্মৃতির আলোয় কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয়
Image

৭০তম বার্ষিকী উদযাপন উৎসব আসছে ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর, স্মৃতির আলোয় কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয়

৷৷পরিতোষ বিশ্বাস৷৷

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর ক্ষত তখনও শুকিয়ে যায়নি, গোটা দেশজুড়ে স্বাধীনতার উত্তাল হাওয়া৷ অগ্ণিযুগের রেশ রাজন্য শাসিত ত্রিপুরায়ও লাগেনি তেমন নয়৷ ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাষ্ট ভারত দ্বিখন্ডিত স্বাধীনতা পেল৷ আর তখনই টানাটানি চলে রাজন্য শাসিত ত্রিপুরাকে নিয়ে৷ সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রিজেন্ট মহারাণী কাঞ্চনপ্রভা দেবী ভারতে যোগদানের অঙ্গিকারপত্রে স্বাক্ষর করেন ১৯৪৯ সালে৷ সেই রাজন্য যুগে, ভারতভুক্তির প্রায় এক বছর পূর্বে ১৯৪৮ সালে  আঠারমুড়া ও লংতরাই পাহাড়ের প্রায় পাদদেশে, ধলাই নদীর পাড়ে, মিশ্র বসতির কুলাই গ্রামে স্থাপিত হয়েছিল কুলাই সুকল৷ এখানে উল্লেখযোগ্য যে, লংতরাই পাহাড়ের গর্ভ থেকেই ধলাই নদীর আবির্ভাব৷ কুলাই বাজার থেকে সেই সুউচ্চ লংতরাই পাহাড় দেখা যায়৷ যেন মনে হয় কাল চাদরে ঢাকা পড়ে আছে পাহাড়ের অরণ্য রাশী৷ অনন্তকাল যেন এই একইভাবে লংতরাই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে৷ ধলাই নদীর জন্মদাত্রি লংতরাই এলাকার মানুষের কাছে প্রণম্য, শৈশবের স্মৃতি৷ সেই লংতরাইয়ের ধলাই নদীর পাড়ে কুলাইতে শিক্ষার আলোর সংগ্রাম শুরু হয়৷ দিগন্ত বিস্তৃত কুলাই এলাকা সবুজের সমারোহে, পাহাড়ের হাতছানিতে উদ্বেলিত মানুষ শিক্ষার প্রসারের সংগ্রামে কিভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে তাও এক ইতিহাস৷ প্রাথমিক বা প্রথম শ্রেণী থেকেই কুলাই সুকল যাত্রা শুরু করে৷ সরকারী রেকর্ড এমন কি গুগুল ঘেটে পাওয়া তথ্যেই জানা গেল সুকলের যাবতীয় তথ্য৷ সেই হিসেবেই কুলাই দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয় আজ সত্তর বছরের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ৷ রাজন্য যুগে, যখন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে, সেই সময় কুলাইয়ের মতো প্রত্যন্ত গ্রামে সুকল গড়ে উঠার ঘটনাকে স্মরণীয় ও বরণীয় করার দায় আমরা কী অস্বীকার করতে পারি? ধলাই নদী তখনো আগ্রাসী হয়ে উঠেনি৷ সেই নদী তখন যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করতো৷ কমলপুর থেকে কুলাই নদীপথে পণ্য আনা ও নেওয়া হত৷ শুধু পণ্য নয়, নদীপথে জনপরিবহণের ইতিহাসও আজ আমাদের কাছে বিস্ময় জাগায়৷

পঞ্চাশের দশকে কুলাই বাজার ছিল অন্যতম ব্যবসায়িক কেন্দ্র৷ নানা প্রান্তের ব্যবসায়ীরা সেখানে হাজির হতেন৷ সেই সময় এই এলাকার আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি ভাল ছিল না৷ ছন বাঁশের ঘরই ছিল অধিকাংশ ক্ষেত্রে৷ কিন্তু কুলাইতে ছিল বর্ধিষ্ণু বাজার৷ হাটবারের অন্তত দুই দিন আগেই ক্রেতা বিক্রেতারা কুলাইতে হাজির হবার ঘটনাও আছে৷ লংতরাই ও আঠারমুড়া থেকে উপজাতি অংশের মানুষ দল বেঁধে নেমে আসতেন এই বাজারে৷

দারিদ্রের কষাঘাতে নিমজ্জিত ধলাই পাড়ের মানুষ অন্ধকার ভেদ করে আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন৷ সুনির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া যায়নি৷ রাজন্য যুগে কুলাইতে চালু হওয়া এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ই ধাপে ধাপে দ্বাদশ শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে৷ আর এই ধারাবাহিকতার ইতিহাস ও কুলাই দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয় আমাদের কাছে অনেক বেশি গর্বের৷ তৎকালীন কুলাই এলাকার শিক্ষানুরাগী মহল কত বেশী বিচক্ষণ ও শিক্ষাপ্রেমী ছিলেন তার প্রমাণ রাজন্য আমলেই সুকল প্রতিষ্ঠার ইতিহাসই বৃহত্তম নজীর বলে মনে করা যেতে পারে৷ অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণে এই সংগ্রামের গরিমাকে আজ স্মরণ করা আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব বলেই মনে করা উচিত৷

ত্রিপুরা ছিল স্বাধীন রাজ্য৷ বৃটিশকে কর দিয়ে রাজত্ব চালাতেন ত্রিপুরার রাজারা৷ তাই এই ত্রিপুরা করদমিত্র রাজ্য হিসেবেও পরিচিত ছিল৷ ১৯৪৯ সালে ত্রিপুরার ভারতভুক্তির পরই শিক্ষার সংগ্রাম আরও তীব্র হয়৷ এলামনি এসোসিয়েশন, কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয় এই শিক্ষার সংগ্রামকে আরো বেশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে অগ্রণী ভূমিকা নিতে চাইছে৷ দীর্ঘ ৭০ বছরের ইতিহাসকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এলামনি এসোসিয়েশন কতটা সফল হবে এখনই বলা কঠিন৷ তবে, ৭০তম বার্ষিকী উদযাপনে অগ্রণী হওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাহসিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে৷ কারণ, এবারই প্রথম কুলাই দ্বাদশ সুকলের জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে প্রাক্তন ছাত্ররা যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা অভিনন্দন যোগ্য৷ প্রাথমিক সুকল থেকে দ্বাদশ সুকলে উন্নীত হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের গর্ব, আমাদের প্রেরণা৷ এই গৌরব তখনই মহিমান্বিত হবে যখন সুকলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা নতুন প্রজন্মের সামনে সংহতি, ঐক্য ও শিক্ষার সংগ্রামকে আরো বেশি সক্রিয়  করতে সক্ষম হবেন৷ কুলাই সুকলের গৌরবের ইতিহাস খঁুজে পেতে আমাদের অনেক বেশি চেষ্টা করতে হয়েছে৷ রেকর্ড হারিয়ে গেছে, তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না৷ আগামী দিনে যাতে সুকলের যাবতীয় তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যায় বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম যাতে সুকলের তথ্য ইতিহাস থেকে বঞ্চিত না হয়, এটা যাতে প্রেরণার উৎসস্থল হয়ে থাকে সেই চেষ্টা করতে হবে৷ সুকলের ৭০তম বছর উদযাপনের সিদ্ধান্তে সুকলের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা অকুন্ঠচিত্তে স্বাগত জানিয়েছেন৷ এই সুকল থেকেই অনেক ছাত্রছাত্রী আজ স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন৷ এই সুকলের বহু ছাত্রছাত্রী ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত হয়েছেন৷ একসময়ের অখ্যাত একটি গ্রাম বিখ্যাত হয়ে উঠার পেছনে একটি বিদ্যালয়ের কত বড় অবদান বা ভূমিকা থাকতে পারে তার বড় প্রমাণ বোধ হয় কুলাই দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়৷ এই সুকলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকেই অনেকে এই সুকলের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন বা করছেন৷ এই গর্বের বোধ হয় তুলনা হয় না৷ সাহিত্য, সংসৃকতি ও রাজনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে একটি অগ্রণি গ্রাম কুলাই৷ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই গ্রাম অনেক বেশি অগ্রসর৷ ত্রিপুরা ভারতভুক্তিতে স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গে  ত্রিপুরায় চালু হয় চিফ কমিশনারি শাসন৷ ১৯৫২ সালে সারা দেশের সাথে প্রথম সাধারণ নির্বাচন ত্রিপুরাতেও অনুষ্ঠিত হয়৷ সেদিন গণতন্ত্রের মুক্ত বাতাস প্রাণ ভরে গ্রহণ করে পাহাড় বনানি ঘেরা ত্রিপুরার মানুষ৷ সেই সময় পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ঢল ত্রিপুরার সামগ্রিক ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটে৷ গণতান্ত্রিক ভারতের সাথে সংযুক্তি হলেও ত্রিপুরা দীর্ঘ সময় ছিল কেন্দ্রের শাসনাধীন৷ চিফ কমিশনারি শাসনের পর ১৯৬৩ সালে ত্রিপুরায় প্রথম বিধানসভার সূচনা হয়৷ গণতন্ত্রের সামান্য অনুভব রাজ্যবাসীর ভাগ্যে জুটে৷ কেন্দ্রীয় শাসনাধীনে রাজ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়৷ কুলাই সুকল উন্নীতকরণের ক্ষেত্রে ত্রিপুরার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহের বিরাট ভূমিকা ছিল৷ ১৯৬৩ সালে কুলাই সুকলকে উচ্চ বুনিয়াদী স্তর থেকে হাইসুকলে উন্নীত করার জন্য এলাকার অভিভাবকরা মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহের দ্বারস্থ হয়েছিলেন৷ কিন্তু, স্নাতক শিক্ষক না পাওয়ার কারণে সুকল চালু করতে বিলম্ব হয়েছে৷ সেই ১৯৬২ সালের টালমাটাল ঘটনার সাথে শিক্ষার সংগ্রাম স্তব্ধ হয়নি৷ সেই সময় ভারত প্রতিরক্ষায় অনেক বেশি পিছিয়ে ছিল, শুধু প্রতিরক্ষা নয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনগ্রসর, রিক্ত ভারত উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যখন কর্মব্যস্ত তখনই চীন-ভারত যুদ্ধ এক বিড়ম্বনা এনে দিল৷ যে দেশ বিশ্বজুড়ে শান্তির পঞ্চশীল নীতি প্রচারে মগ্ণ ছিল, সেই দেশ আক্রান্ত হয়ে অসহায়ভাবে ছটফট করেছে৷ তখন ব্যয়সংকোচের থাবা থেকে সুকলগুলিও বাদ যায়নি৷ ছিল কাগজ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা৷ অসহায় ভারত সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছিল দেশের আপামর জনগণ৷ নগদ অর্থ সাহায্য ছাড়াও কুলাই এলাকার মহিলারাও নিজেদের স্বর্ণালঙ্কার সরকারের কোষাগারে তুলে দিয়েছিলেন৷ ভগ্ণ অর্থনীতি নিয়ে যে স্বাধীন ভারতের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেখানে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ ভারতের চোখ খুলে দিয়েছিল৷ শুরু হয়েছিল নতুন সংগ্রাম৷ দেশ রক্ষার কাজে তখন ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুত হতে আহ্বান জানানো হয়েছিল৷ শুরু হয়েছিল সুকলে সুকলে রাইফেল ট্রেনিং৷ ক্যাম্প করে সেনা জওয়ানরা কুলাই সুকলে ছাত্রছাত্রীদের রাইফেল ট্রেনিং দিয়েছেন৷ মাসব্যাপী ট্রেনিংয়ের পর কুলাই সুকলের পেছনে পাহাড় ঘেরা জঙ্গলে ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীরা রাইফেল চালাতেন৷ প্রয়োজনে ছাত্রছাত্রীদেরও দেশরক্ষার জন্য যুদ্ধে যাবার লক্ষ্যে তারই প্রস্তুতি ছিল৷ এখন আর সুকলে সুকলে ছাত্রছাত্রীদের রাইফেল ট্রেনিং দেওয়া হয় না৷

ছোট ক্লাশেই দেখেছি, ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনার বিষয়ে শিক্ষকরা কতখানি যত্নবান ছিলেন৷ প্রতিদিনের পড়া শিখে না গেলে শাস্তি ছিল অনিবার্য্য৷ সুকল ছুটি হয় বিকাল চারটায়৷ কিন্তু পড়া না শিখলে ছুটি দিতেন না শিক্ষক৷ পড়া শিখে রাত আটটায় ছাত্র বা ছাত্রীরা বাড়ী গেছেন৷ শিক্ষক ঠায় বসে পড়া নিয়েছেন৷ প্রয়োজনে বাড়ী পৌঁছে দেবারও ব্যবস্থা করেছেন৷ এমন নজীর কি এখন ভাবা যায়? শুধু তাই নয়, পড়াশুনায় ছাত্রছাত্রীদের গাফিলতি ইত্যাদির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক এমনকি প্রধান শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের বাড়ীতে চলে যেতেন এবং অভিভাবকদের নজরে নিতেন৷ এই অভিজ্ঞতা আমার সুকল জীবনে একাধিকবার হয়েছিল৷ শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক কত নিবিড় ও শ্রদ্ধার হতে পারে তা আজ বোধহয় ভাবাই যায় না৷ শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের অগাধ শ্রদ্ধা ছিল৷ একটি উদাহরণ, কোনও ছাত্র সাইকেল বা রিক্সায় চড়ে যাচ্ছেন তখন রাস্তায় সুকলের কোনও শিক্ষক ওই সড়কে হেঁটে যাচ্ছেন বা আসছেন দেখলেই ছাত্র রাস্তায় নেমে পড়ে শিক্ষককে সম্মান জানাতেন৷ ছাত্ররা যেমন শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করতেন, তেমনি শিক্ষকরাও ছাত্রদের শাসন করতেন, স্নেহ করতেন৷ উজার করে দিতেন জ্ঞান ভান্ডার৷ আগে আজকের মতো এমন প্রাইভেট ট্যুইশানির দৌরাত্ম ছিল না৷ সুকলেই পঠন পাঠন হত৷ পড়া শিখে না গেলে শাস্তির মুখে পড়তে হত৷

জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়ষী৷ কুলাই আমার জন্মভূমি ও শিক্ষাভূমি৷ শৈশব ও কৈশোরের সেই স্মৃতি আজও, এই বার্ধক্যেও চোখে জল আনে, কষ্ট হয়, ফিরে না পাওয়ার কষ্ট৷ আমার মতো যারা তাঁদের অন্তরের টান আলাদা৷ অষ্টম ও নবম শ্রেণী থেকেই সুকলের পঠন পাঠনেই আমি আবদ্ধ থাকতে চাইতাম না৷ সুকলের সাহিত্যসভা, বিতর্কসভা, নাটক ইত্যাদি নানা কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাকতাম৷ আমি যখন নবম শ্রেণীতে পাঠরত তখন প্রথম ছাপার অক্ষরে সুকল ম্যাগজিন ‘আন্তর’ প্রকাশ হয়েছিল৷ এই সুকল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলাম আমি৷ সেই ছাপার অক্ষরে প্রথম ‘আন্তর’ এর আত্মপ্রকাশে সেদিন শুধু রোমাঞ্চিত হইনি, উল্লসিত হয়েছি৷ যেন বিরাট কিছু জয় করে ফেলেছি৷ বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাহিত্য প্রতিযোগিতা ও ছাপার অক্ষরে সাহিত্য পত্র ‘আন্তর’ প্রকাশের ঘটনা একটি গ্রামের সুকলে কত বিশাল তা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখে না৷ সুকলের এই সব কর্মকান্ডে জড়িয়ে থাকার অনুভূতিই আমাদেরকে এগিয়ে যাবার শক্তি যুগিয়েছে৷ সুকলে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণীতে যেদিন আমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হই তখনই সেই সাধনাতে আরও বেশী মগ্ণ হয়ে পড়ি৷ তারই ফলশ্রুতিতে বোধ হয় আমি ত্রিপুরার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র জাগরণ এর সত্বাধিকারী ও সম্পাদকের মতো গুরু দায়িত্ব পালন করতে পারছি৷ এই শক্তির উৎস আমার সুকল, এই সুকলই দিয়েছে আমাকে প্রেরণা৷ এই ইতিহাস নিঃসন্দেহে আজকের প্রজন্মের কাছে একটি শিক্ষা হতে পারে৷ এই বিষয়গুলি এই পরিসরে তুলে না ধরলে বোধহয় ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হত৷

সুকল জীবনের স্মৃতি সবটাই এখানে তুলে ধরা হয়তো অসম্ভব৷ অসম্ভব এই কারণে যে, তাহলে কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে৷ তাই অনেক টুকরো টুকরো স্মৃতি যেগুলি হয়তো আজকের যুগে অনেকখানি প্রাসঙ্গিক, সেগুলি তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে৷ শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক কত গভীর হতে পারে তা এখন হয়তো ভাবা যায়না৷ আমার এই কথাগুলো তুলে ধরার বড় কারণ বর্তমানে যে অবক্ষয় শিক্ষাকে কলুষিত করছে তার হাত থেকে মুক্তি পথের সন্ধান হয়ত পাওয়া যেতে পারে৷

সুকলের প্রতি সেই যে টান, তাকে উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ নেই৷ আর এজন্যই কুলাই সুকলের প্রাক্তনীদের নিয়ে এই সুকলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালনের লক্ষ্যে আমি কয়েকবছর আগেই উদ্যোগ নিয়েছিলাম৷ সেই এলাকায় বসবাসরত প্রাক্তন ছাত্র বা নেতার দ্বারস্থও হয়েছিলাম৷ কিন্তু, কাকস্য পরিবেদনা৷ শেষ পর্যন্ত গত অগাষ্ট মাসেই নেমে পড়লাম কুলাইতে৷ চষে বেড়ালাম প্রাক্তন ছাত্রদের বাড়ীঘর৷ যথেষ্ট সাড়া পাওয়া গেল৷ তেরই অগাষ্ট ২০১৮ কুলাই সুকলের প্রাক্তন ছাত্রদের নিয়ে বৈঠকে গঠিত হল এলামনি এসোসিয়েশন, কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয় এডহক কমিটি৷ এই কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হল আমাকে৷ এরপর গত উনিশ অগাষ্ট আমার সভাপতিত্বে বর্দ্ধিত কলেবরে সাধারণ সভায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়ে গেল৷ এরপর এক সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় আগামী ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮ কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয়ের ৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করবে এলামনি এসোসিয়েশন৷ চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি৷

কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয় ও এই সুকলের মাঠ ভারতের প্রতিপক্ষ তৎকালীন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আক্রমন শানাতে ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনা বাহিনী ব্যবহার করেছিল৷ পাকিস্তানের শ্রীমঙ্গলে পাক বাহিনীর সেনা ছাউনিতে ভারতীয় বাহিনী আক্রমণ শানাত এই কুলাই সুকল মাঠ থেকেই৷ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ও বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাসে কুলাই সুকল ও সুকল মাঠের অবদান সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করতেই হয়৷

একটি সুকলের সত্তরতম বছর পালনকে কেন্দ্র করে এই এলাকাই শুধু নয়, রাজ্য ও দেশের ক্রম বিবর্তনের ইতিহাসকে স্মরণ করার সুযোগ এনে দেয়৷  সবচাইতে বড় কথা, হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে পুনরুদ্ধার করে এক মহামিলন মেলায় সামিল হওয়া৷ অনেক প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রী যিনি এখন কর্মজীবনে ব্যতিব্যস্ত আছেন তাঁরা ছুটে আসছেন মাটির টানে, শিকড়ের আকর্ষণে৷ এই শিকড় ও মাটিকে দূরে সরিয়ে দেয়া অসম্ভব৷ দেশের ও বিদেশের মাটিতে কর্মব্যস্ত প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা দুদিনের মহা মিলনে যোগ দেবেন বলে জানা গেছে৷ রাজনীতির ভেদাভেদের উর্ধে উঠে কুলাই দ্বাদশ বিদ্যালয় সত্তর তম বছর উদযাপনে সাফল্য কামনা করছি৷ বলা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, চর্চা ও অনুসন্ধানের অভাবে অনেক ইতিহাস হারিয়ে যায়৷ প্রতিটি সুকলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে অত্র এলাকার ইতিহাস উঠে আসে৷ অনেক অজানা তথ্যে সমৃদ্ধ হবার সুযোগ এনে দেয়৷

Releated Posts

কর্ণাটক মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে কেউ ইস্তফা দেননি, দলে কোনও অসন্তোষ নেই: কংগ্রেস সভাপতি বি. কে. হরিপ্রসাদ

বেঙ্গালুরু, ৪ আগস্ট (আইএএনএস): কর্ণাটকে সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণকে ঘিরে কংগ্রেসের অন্দরে ব্যাপক অসন্তোষের জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে কর্ণাটক প্রদেশ…

ByByNews Desk Aug 4, 2026

সমঝোতার সম্ভাবনায় আপাতত ইরানে হামলা স্থগিত, দাবি ট্রাম্পের; হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার কথাও উল্লেখ

ওয়াশিংটন, ২ আগস্ট (আইএএনএস): যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত…

ByByNews Desk Aug 2, 2026

সূর্য ঘরে এখন ১৫ মেগাওয়াটের শক্তি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নীরব বিপ্লব রাজ্যে

আগরতলা, ২৮ জুলাই:একটি বাড়ির ছাদে কয়েকটি সোলার প্যানেল। সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুৎ যাচ্ছে বাড়ির আলো,…

ByByReshmi Debnath Jul 28, 2026

অক্সিলিয়াম গার্লস স্কুলে ‘আউক্সি ইগনিট এনোএল এক্সিবিশন ২০২৬’, ছাত্রীদের সৃজনশীলতা ও প্রতিভার প্রকাশ

আগরতলা, ২৫ জুলাই: ছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশের লক্ষ্যে অক্সিলিয়াম গার্লস স্কুল, আগরতলার উদ্যোগে বিদ্যালয়…

ByByNews Desk Jul 25, 2026
Scroll to Top